কুরআনের যে সুরা দোয়া ও শেফা

0
91

কুরআনুল কারিম। যার প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য ফজিলত ও বরকতে ভরপুর। এ আসমানি কিতাবের প্রথম সুরা এমনি এক ফজিলত ও বরকতময় সুরা। যা প্রতিটি মানুষের জন্য গুরত্বপূর্ণ দোয়া ও রোগ থেকে মুক্তির শেফা।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত লাভের একেবারেই প্রথম দিকে পুরো সুরাটি একসঙ্গে নাজিল হয়। যে সুরা পড়া ছাড়া মুমিনের নামাজ হয় না। এ সুরাটি পবিত্র কুরআনের ভূমিকাও বটে।

মুমিন মুসলমানের জন্য এ সুরাটি হচ্ছে দোয়া। যে কোনো ব্যক্তিই কুরআন পড়া শুরু করলে আল্লাহ তাআলা তাকে প্রথমেই এ দোয়াটিই শিখিয়ে দেন। আর এ কারণে সুরাটিকে কুরআনুল কারিমের প্রথম সুরা হিসেবে স্থান দেয়া হয়েছে।

মানুষের যে জিনিসের আকাঙ্খা সবচেয়ে বেশি থাকে, সে জিনিস লাভের প্রার্থনাই বেশি করে থাকে। দুনিয়াতে মানুষের সবচেয়ে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাহলো হেদায়েত ও সঠিক পথ পাওয়া। আর তা পেতে হলে প্রয়োজন কুরআন অনুযায়ী জীবন গড়া। কুরআনের নেয়ামত লাভের দোয়াই হলো এ সুরা।

বুঝার সুবিধার্থে সুরাটির অনুবাদ তুলে ধরা হলো-

– সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি পুরো বিশ্বজগতের অধিপতি।
– তিনি পরম দয়ালু ও করুনাময়।
– তিনি প্রতিদান দিবসের মালিক।
– আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য চাই।
– তুমি আমাদের সোজা (হেদায়েতের) পথ দেখাও।
– তাদের পথ, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ।
– তাদের পথ নয়, যারা অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট।’ (সুরা ফাতেহা)

সুরা ফাতেহায় শেফা
মানবজাতির জন্য কুরআন যেমন শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ তেমনি শ্রেষ্ঠ সুরাও এটি। যদি কেউ এ সুরার আমল ও অধ্যয়ন যথাযথভাবে মেনে চলে তবে তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব সমস্যার সমাধানেও রয়েছে তাতে। সুরা ফাতেহা সব রোগের মহৌষধ। এটি মানুষের রোগ-ব্যধিতে অনেক বড় শেফা-
– হজরত জাফর সাদেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, সুরা ফাতেহা ৪০ বার পাঠ করে পানির ওপর দম করে কোনো জ্বরে আক্রন্ত লোকের মুখমণ্ডলে ছিঁটিয়ে দিলে, এর বরকতে জ্বর দূরীভূত হয়ে যাবে।
– ফজরের নামাজের সুন্নত ও ফরজ নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে ৪১ বার এ সুরা পাঠ করে চোখে ফুঁ দিলে চোখের ব্যথা দূর হয়।
– শেষ রাতে এ সুরা ৪১ বার তেলাওয়াত করলে আল্লাহ তাআলা রিজিক বাড়িয়ে দেন।
– এ সুরা ৪০ দিন নিয়মিত তেলাওয়াত করে পানিতে ফুঁ দিয়ে অসুস্থ ব্যক্তিকে পান করালে আল্লাহ অসুস্থতা দূর করে দেবেন।
– দাঁত, পেট ও মাথা ব্যথার জন্যে সুরাটি ৭ বার তেলওয়াত করে ফুঁ দিলে আল্লাহ এ ব্যাথ্যা থেকে মুক্তি দেন।
– হজরত ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, সাহাবাদের একটি দল এক পানির কুপওয়ালার কাছে গেলেন। তাদের (কুপওয়ালাদের) একজনকে বিচ্ছু অথবা সাপে দংশন করেছিল।
কুপওয়ালাদের এক ব্যক্তি এসে বলল, আপনাদের মধ্যে কোনো মন্ত্র জানা লোক আছে কি? এ পানির ধারে বিচ্ছু বা সাপে দংশন করা একজন লোক আছে।
সাহাবাদের মধ্যে একজন (আবু সাঈদ খুদরি) গেলেন এবং কয়েকটি ভেড়ার বিনিময়ে তার উপর সুরা ফাতেহা পড়ে ফুঁ (দম করলেন) দিলেন। এতে সে ভাল হয়ে গেল এবং তিনি ভেড়াগুলো নিয়ে সঙ্গীদের কাছে আসলেন।
তারা (সাহাবারা) এটা অপছন্দ করল এবং বলতে লাগল, আপনি কি আল্লাহর কিতাবের বিনিময় গ্রহণ করলেন?
অবশেষে তারা মদিনায় পৌঁছে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিনি আল্লাহর কিতাবের বিনিময় গ্রহণ করেছেন।
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা যেসব জিনিসের বিনিময় গ্রহণ করে থাক, তার মধ্যে আল্লাহর কিতাব অধিকতর উপযোগী’। (বুখারি)

– অন্য বর্ণনায় আছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমরা ঠিক করেছ। ছাগলের একটি ভাগ আমার জন্য রাখ।’ (বুখারি ও মুসলিম)

কুরআনের শ্রেষ্ঠ দোয়া
সুরাটি কুরআনের ভূমিকাই নয় বরং এটি শ্রেষ্ঠ দোয়াও বটে। এ সুরা তেলাওয়াত করা ছাড়া নফল, ওয়াজিব কিংবা ফরজ ছাড়া কোনো নামাজই হবে না। শ্রেষ্ঠ দোয়া সুরা ফাতিহার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নামাজ ফরজ ওয়াজিব সুন্নাত নফল যা-ই হোক না কেন, সুরা ফাতিহা ছাড়া কোনো নামাজই হবে না। এ দোয়ার বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় হাদিসে এসেছে-

– ‘আল্লাহ তাআলা এ সুরায় নিজের ও বান্দার মধ্যে করণীয় ভাগ করে নিয়েছেন। এ সুরাকে বাদ দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন সম্ভব নয়।’ (সুরা হিজর, কুরতুবি, বুখারি, মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি, মুসলিম, মিশকাত)

– হজরত উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ উম্মুল কুরআনের মতো তাওরাত ও ইঞ্জিলে কিছু্ নাজিল করেননি। এটিকেই বলা হয়, ‘আস-সাবউল মাছানি’ (যা বারবার পঠিত সাতটি আয়াত), যাকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। আর আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে, সে যা চাইবে’। (নাসাঈ, মুসনাদে আহমদ)

– হজরত সাঈদ ইবনে মুআল্লা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, তিনি মসজিদে নামাজ আদায় করছিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ডাকলেন। কিন্তু তিনি তাঁর ডাকে সাড়া দেননি। অতপর নামাজ শেষ হলে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমি নামাজ পড়ছিলাম।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ কি বলেননি? ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তোমাদেরকে ডাকা হয়।’ (সুরা আনফাল : আয়াত ২৪)
অতপর আমাকে বললেন, মসজিদ থেকে তোমার বের হওয়ার আগেই আমি তোমাকে অবশ্যই কুরআনের সবচেয়ে মহান সুরাটি শিক্ষা দেব। অতপর তিনি আমার হাত ধরলেন। যখন তিনি মসজিদ থেকে বের হতে চাইলেন, তখন আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম, আপনি কি আমাকে বলেননি যে, তোমাকে আমি কুরআনের সবচেয়ে মহান সুরাটি শিখিয়ে দেব?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সুরাটি হচ্ছে- الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ । এটিই সাবউল মাছানি এবং কুরআনুল আজিম। যা আমাকে দেয়া হয়েছে।’ (নাসাঈ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ)

– হজরত ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে জিবরিল আলাইহিস সালাম উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ জিবরিল আলাইহিস সালাম ওপর দিকে এক শব্দ শুনতে পেলেন এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, এ হচ্ছে আকাশের একটি দরজা যা আগে কখনো খোলা হয়নি।
সে দরজা দিয়ে একজন ফেরেশতা অবতীর্ণ হলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, ‘আপনি দুটি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন। যা আপনাকে প্রদান করা হয়েছে। তা আপনার আগে আর কোনো নবিকে দেয়া হয়নি। তাহলো-
– সুরা ফাতেহা এবং
– সুরা বাক্বারার শেষ দুই আয়াত।
আপনি সে দু’টি থেকে কোনো অক্ষর পড়লেই তার প্রতিদান আপনাকে প্রদান করা হবে।’ (মুসলিম, ইবনে হিব্বান)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সুরা ফাতিহার তেলাওয়াত ও আমলের মাধ্যমে অসুস্থতা ও সমস্যা থেকে মুক্তির পাশাপাশি সুরাটি যাবতীয় ফজিলত ও বরকত লাভ করার তাওফিক দান করুন। সুরার হক অনুযায়ী ইবাদত ও সাহায্য প্রার্থনার করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপনার মতামত লিখুন :