অক্সফোর্ডের সফল ভ্যাকসিন যেভাবে তৈরি হলো

0
32

ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি নভেল করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন চ্যাডক্স১এনকোভ-১৯ সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীদের দেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের প্রথম ফল প্রকাশ করা হয়েছে। প্রথম ক্লিনিকাল ট্রায়ালে ভ্যাকসিনটি ‘নিরাপদ’ এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা ‘উজ্জীবিত’ করতে পারে বলে প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছেন অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীরা।

সোমবার বিখ্যাত আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেটে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের প্রথম ধাপের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যারা এই ভ্যাকসিনটির দু’টি ডোজ গ্রহণ করেছিলেন তাদের শরীরে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তৈরির আদ্যোপান্ত

অক্সফোর্ডের কোভিড-১৯ এর চ্যাডক্স১ এনকোভ-১৯ নামের ভ্যাকসিনটি তৈরির কাজ নজিরবিহীন গতিতে এগিয়ে চলছে। শিম্পাঞ্জির শরীরের সাধারণ সর্দিকাশি তৈরি করে, এমন একটি ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন করে এই ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়।

ভাইরাসের এই পরিবর্তন ব্যাপকভাবে করা হয়েছে, যাতে তা মানবদেহে ঘটাতে না পারে। এটিকে করোনাভাইরাসের কাছাকাছি একটি রূপ দেয়া হয়েছে।

যে ভ্যাকসিনটি তৈরি করা হচ্ছে, তার ভেতরে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের জিনগত বৈশিষ্ট্য ঢুকিয়ে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এর অর্থ হলো, ভ্যাকসিনটি করোনাভাইরাসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তখন শরীরের ভেতর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা করোনাভাইরাসকে পরাস্ত করার কৌশল শিখতে পারে।

অ্যান্টিবডি এবং টি-সেল কী?

করোনাভাইরাসের প্রতিরোধে এখনও বেশিরভাগ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে অ্যান্টিবডিতে। তবে এটি মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি অংশ মাত্র। অ্যান্টিবডি হচ্ছে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার তৈরি করা ছোট আকারের প্রোটিন; যা ভাইরাসের সঙ্গে সেটে যায়। এই অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাসকে অকার্যকর করে দিতে পারে।

টি-সেল, রক্তের সাদা একটি অংশ আক্রান্ত কোষগুলোকে শনাক্ত এবং ধ্বংস করতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সাহায্য করে। প্রায় সব কার্যকর ভ্যাকসিন অ্যান্টিবডি এবং টি-সেল ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলার মাধ্যমে কাজ করে।

ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যাকসিনটি প্রয়োগের ১৪ দিন পর টি-সেলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। তবে অ্যান্টিবডির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায় ২৮ দিন পর। দীর্ঘমেয়াদী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা টিকে থাকতে পারে কিনা সেটি এখনও যাচাই করে দেখতে পারেননি গবেষকরা।

অক্সফোর্ড রিসার্চ গ্রুপের সদস্য অধ্যাপক অ্যান্ড্রু পোলার্ড বলেন, আজ যে ফল প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়ে আমরা আসলেই সন্তুষ্ট। আমরা নিরপেক্ষ অ্যান্টিবডি এবং টি-সেল; দুটিই দেখতে পেয়েছি।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক ডোজ নেয়ার পর প্রায় ৯০ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। মাত্র ১০ জনকে দুটি ডোজ দেয়া হয়েছিল এবং তাদের শরীরে নিরপেক্ষ অ্যান্টিবডি বেশি তৈরি হয়েছে।

ভ্যাকসিনটি কি নিরাপদ?

এটি নিরাপদ, তবে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। যদিও সেগুলো খুব বিপজ্জনক কিছু নয়। পরীক্ষায় অংশ নেয়া ৭০ শতাংশ স্বেচ্ছাসেবী বলেছেন, ভ্যাকসিন নেয়ার পর তাদের জ্বর অথবা মাথাব্যথা হয়েছিল। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, প্যারাসিটামল সেবনের মাধ্যমে তা কমানো যেতে পারে। ভ্যাকসিনটি প্রয়োগের ফলে তীব্র কোনও কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হয়নি।

অক্সফোর্ডের করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কারক দলের প্রধান সারাহ গিলবার্ট বলেছেন, করোনাভাইরাস মহামারি নিয়ন্ত্রণে আমাদের ভ্যাকসিন কাজ করবে কিনা, সেটি নিশ্চিত হতে এখনও আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। তবে প্রাথমিক এই ফল বেশ আশাব্যাঞ্জক।

তিনি বলেন, সার্স-কোভ-২ সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষার জন্য শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা বাড়ানো দরকার সেটি এখনও আমরা জানি না। গিলবার্ট বলেন, কোভিড-১৯ সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানা দরকার গবেষকদের। এছাড়া শেষ ধাপের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া দরকার; যা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

পরবর্তী পরীক্ষায় যা হবে

অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফল যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক হলেও এর মূল উদ্দেশ্য সব মানুষকে দেয়াটা নিরাপদ কিনা, সেটি নিশ্চিত হওয়া। ভ্যাকসিনটি মানুষজনকে অসুস্থতা থেকে রক্ষা করবে নাকি তাদের কোভিড-১৯ উপসর্গ কমিয়ে দেবে; গবেষণায় তা জানা যায়নি।

প্রথম ধাপের ফল আজ প্রকাশিত হলেও অক্সফোর্ডের এই ভ্যাকসিনটির তৃতীয় বা চূড়ান্ত পর্যায়ের পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্রাজিলে ৪০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবীর দেহে প্রয়োগ করা হবে। এই পরীক্ষা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এর ফল পেতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ হাজার, যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার ও ব্রাজিলে ৫ হাজার এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ২ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে ভ্যাকসিনটি দেয়া হবে।

কখন পাওয়া যাবে?

চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই করোনার ভ্যাকসিন কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। তবে কার্যকর হলেও তা সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক সহজলভ্য হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বয়স এবং চিকিৎসা বিবেচনায় উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা স্বাস্থ্য ও সেবাকর্মীরা আগে পেতে পারেন।

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের শুরুর দিকে গণহারে ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হতে পারে।

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথমবারের মতো নভেল করোনাভাইরাসের উৎপত্তি শনাক্ত হয়। এর পর বিশ্বের দুই শতাধিক দেশে ছড়িয়ে প্রায় দেড় কোটি মানুষকে আক্রান্ত এবং ৬ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ কাড়লেও এখন পর্যন্ত এর কোনও ভ্যাকসিন কিংবা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স।

আপনার মতামত লিখুন :