এবার ক্রেতারা জিতলেও ঠকছেন খামারিরা

0
54

বগুড়ার ধুনট উপজেলার উল্লাপাড়া গ্রামের হায়দার আলী এবং তার আরও দুজন অংশীদার মিলে ৯৬ হাজার টাকা দিয়ে একটি কোরবানির গরু কিনেছেন। কসাইসহ অভিজ্ঞরা বলছেন, গরুটির নিট মাংস হবে ৬ মণ। তাহলে দেখা যায়, প্রতি মণ মাংসের দাম পড়লো ১৬ হাজার টাকা। আর প্রতি কেজির দাম পড়ছে ৪০০ টাকা। অথচ এখনও বগুড়া শহরসহ বিভিন্ন স্থানে সাড়ে ৫শ টাকা কেজি দরে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। সবমিলিয়ে ক্রেতারা জিতলেও ঠকছেন গরুর খামারিরা।

হায়দার আলী বলেন, আমরা তিনজন অংশীদার গরু কিনে জিতলাম। কিন্তু যে কৃষক তিন বছর ধরে এই গরুটি লালন-পালন করেছেন তিনি কি জিততে পেরেছেন? এই অবস্থা যদি থাকে ওই কৃষকক আগামীতে গরু লালন-পালনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

তিনি বলেন, এলাকার মানুষের মন ভালো না। এর আগে গ্রামের যারা কোরবানি দিতো তাদের অর্ধেক লোক এবার কোরবানি দিচ্ছে না। কারণ করোনা ও সর্বশেষ বন্যায় ঈদ বলতে উত্তরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে কিছু নেই। সর্বশেষ বন্যায় কৃষকের লাখ লাখ বিঘা জমির কাঁচা-পাকা ধান পানিতে ডুবে গেছে। তারা কোরবানির কথা ভাবতেই পারছে না।

হায়দার আলী বলেন, একা ভালো থেকে লাভ নেই। সবাই মিলে ভালো থাকা এবং সবার মুখে হাসি থাকলে সেই ঈদ হয় আনন্দের।

দিনাজপুরের কাহারোল হাটে দেখা গেছে, প্রচুর বলদ গরু। সাদা ধবধবে বিশালাকৃতির (বৈল) বলদ গরুগুলো বাংলাদেশের না। এদের জন্ম ভারতে। প্রতি বছর যেমন লাখ লাখ ভারতীয় গরু বাংলাদেশে আসে এবং লালন-পালন হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

cow2.jpg

দিনাজপুর কাহারোল হাটের ব্যাপারী আমজাদ ফকির বলেন, ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা মণ মাংস ধরে যত গাড়ি গরু লাগে দিতে পারবো। শুধু দিনাজপুর বর্ডার বলে নয়, ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহসহ যেকোনো জেলার গরুর হাটে লক্ষ্য করলে হাজার হাজার ভারতীয় গরু চোখে পড়বে।

গাবতলী হাটের গরু ব্যবসায়ী রানা বলেন, ‘আপনি শুধু পুরো গাবতলী হাটটি ঘুরে এসে তারপর আমাকে বলুন, কত হাজার ইন্ডিয়ান গরু এই হাটে উঠেছে। ক্রেতারা আড়াই লাখ টাকা দিয়ে বৈল গরু কিনলে ১৪/১৫ মণ মাংসের গরু পায়। তাহলে তারা আমাদের দেশি গরু কিনবে কেন?’

বগুড়ার মহাস্থান গবাদিপশুর হাটে দেখা গেছে, দুপুর গড়াতে না গড়াতেই বিশাল হাটের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত শুধু গরু আর গরু। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কিন্তু সে তুলনায় হাটে ক্রেতার আনাগোনা খুব কম। তাই দিন শেষে অনেকটা খুব কম দামে গরু বিক্রি করে হতাশা নিয়ে হাট থেকে ফিরেছেন অনেক কৃষক-খামারি। অন্যদিকে সস্তায় গরু কিনতে পেরে খুশি ক্রেতারা।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়, হাটের ইজারাদার ও গরুর খামারিরা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে এই কোরবানির হাট থেকে শত শত গরু কিনে ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট, ফেনীসহ দেশের বড় বড় শহরে নিয়ে যেতেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া আগে বগুড়া ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে অনেকে কোরবানির পশু কিনতে এই হাটে আসতেন। কিন্তু এবার করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় আগের বছরগুলোর মতো বড় বড় ব্যবসায়ী, ব্যাপারী ও ক্রেতারা আসেননি। তাই এই হাটে গরুর দাম পড়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জের তালগাছি হাটের ব্যাপারী আসমত আলী জানান, যে পরিমাণ গরু হাটে উঠেছে তার অর্ধেকও গ্রাহক নেই। ক্রেতারা যে দাম বলে তাতে লাভের কোনো চিন্তাই আমরা করতে পারছি না। যে দামে গরু কিনেছি তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা মাংসের দাম ধরে গরু বিক্রি করতে হচ্ছে আমাদের।

cow2.jpg

প্রতি বুধবার ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় পশুর হাট বসে। এবারের বুধবারে যে হাট বসেছে তা ঈদের দিন পর্যন্ত থাকবে বলে জানিয়েছেন ব্যাপারীরা।এই হাটের ব্যাপারী কোরবান আলী এসেছেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে। তিনি বলেন, গরুর বাজার এত মন্দা এর আগে কখনও দেখিনি। ১৩টি গরু নিয়ে এসেছি দুদিন ধরে। একটি গরুও বিক্রি করতে পারছি না। যারা বিক্রি করছে তারা লোকসান দিয়ে বিক্রি করছেন। আমাকেও শেষ পর্যন্ত তাই করতে হবে। গত বছর যে গরু ৯০ হাজার টাকা বিকি করেছি সেই ধরনের গরুর এবার বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ হাজারের মধ্যে।

প্রাণীসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আবদুল জব্বার শিকদার বলেন, যেহেতু এবার দেশের পরিস্থিতিটা অস্বাভাবিক সে কারণে অন্য বছরগুলোর তুলনায় কোরবানির সংখ্যা কম হবে। এটা আগেই বলেছি। তবে খামারি ও কৃষকরা যে দাম পাওয়ার কথা ছিল তা পাচ্ছেন না। গত ৫ মাসে দেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো থাকার কথা নয়।

বাংলাদেশ ডেইরি ডেভলপমেন্ট ফোরামের (বিডিডিএফ) সভাপতি অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেছে। একজন আইনজীবী হিসেবে বলতে চাই, আমাদের ৬০ হাজার আইনজীবী আছেন। এর মধ্যে ২০ হাজার আইনজীবী কোরবানি দিতে পারবেন। বাকি ৪০ হাজার আইনজীবী কোরবানি দিতে পারবেন না। করোনা তো আছেই তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যা। এসব কারণেই এবার পশুর দাম পড়ে গেছে।

বিডিডিএফ’র সাধারণ সম্পাদক ও সাদিক এগ্রো লিমিটেডের মালিক ইমরান হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতি ভালো না। এর আগে আমি বলেছি, এবার ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ মানুষ কোরবানি করতে পারবে না। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ। বিগত বছরে যারা ১ লাখ টাকা দিয়ে কোরবানি দিয়েছে তারা
এবার তিনজন মিলে ১ লাখ টাকা বাজেট করেছে। যে কারণে অনেক কৃষক এবং খামারি গরু বিক্রি করতে পারছেন না।

আপনার মতামত লিখুন :