শৈশব স্মৃতিচারণায় কোরবানির ঈদ পিয়ারা বেগম

0
88
কোরবানি ঈদ এলেই মা ব্যস্ত হতেন মশলাপাতি তৈরিতে। গুঁড়া মশলার প্রচলন তখনকার সময়ে গ্রামে তেমন ছিল না। বাটা মশলাই রান্নায় ব্যবহৃত হতো। তবে অগ্রহায়ন মাসে বড় গৃহস্থ বাড়িতে কাইল-সিয়াট দিয়ে হলুদ-মরিচের গুড়ো করা হতো। কারণ, আঘ্রাণে ধান নিয়ে কাজের চাপ থাকত। তাই হাতে করা গুড়ো মশলা ব্যবহৃত হতো। যাক, বলছিলাম কোরবানির ঈদ প্রসঙ্গ। মা লাল টকটকে শুকনো মরিচ রোদে শুকাতেন। পাটনাইয়া হলুদ কিনে আনাতেন বাবাকে দিয়ে। ধনে ধুইয়ে শুকাতেন। তারপর অল্পকিছু তেজপাতা টুকরো করে মিশাতেন। একসাথে হালকা করে খোলায় টালতেন। তাতে সামান্য চালভাজা মিশাতেন। এতে নাকী রান্নাকরা তরকারী গাঢ় হয়। তরকারী স্বাদে-ঘ্রাণেও বৈচিত্র্য আনে। ধনেগুলো কাইল-সিয়াটে গুঁড়ো করতেন। মিহি গুঁড়ো নয়। আধাভাঙ্গা। তারপর ডানো,লেকটোজেন কিংবা ডিপ্লোমা গুঁড়ো দুধের খালি কৌটায় ভরে রাখতেন। মা তরকারীতে বাটা মশলা ব্যবহার করতেন। মশলা বাটার সময় একটা চমৎকার ঘ্রাণ আসত।
কোরবানির সময় ভাইজানরা বাড়ি আসতেন। বাড়ির সব চাকুরীজীবীরা সপরিবারে আসতেন বাড়িতে। পুরো বাড়ি সরগরম থাকত। দু’তিন দিন আগে থেকে তোরজোড় থাকত গরু কেনার আনন্দ। তারপর শুরু হতো এবাড়ি-ওবাড়ি গরু দেখাদেখি। ঈদের আগের দিন মায়ের সে কী ব্যস্ততা। ঝুড়িসেমাই বালু দিয়ে ভেজে গুঁড় দিয়ে পাকাতেন মা। সাথে মিশাতেন খই। পাকানোর সময় আদা কুচিকুচি মিশানো হতো গুঁড়ের সাথে। পাকানো ঝুড়িসেমাই মুখআটা টিনের কৌটায় ভরে রাখতেন মচমচে থাকার জন্য। এগুলো খুবই সুস্বাদু। আমাদের মেঘনা অঞ্চলে এগুলো জনপ্রিয় ছিল তখনকার সময়। ঈদের দিন সকালে দুধ সেমাইয়ের সাথে ঝুড়ি সেমাই একটা উপাদেয় খাবার। তার সাথে থাকত চই সেমাই বা ঝাল সেওই। চালের গুঁড়ো কাই করে বানানো হতো চই সেওই। গুঁড় দিয়ে রান্না হতো। রান্না হয়ে এলে দুধ মিশানো হতো। এই সেওই বাসী হলে আরো মজাদার হতো। তাছাড়া আতপ চালের শিরনিও রান্না হতো। গুঁড়, নারকেল আর দুধের শিরনীর প্রচলনও ছিল ঈদে।
গরু জবাই হতো পুকুর পাড়ে। কারণ, বর্জ্য ফেলার সুবিধে হতো। গরুর ভূরি ফেলে দেওয়া হতো পুকুরের কিনারে। কুকুর আর শকুন কাড়াকাড়ি করে খেত। বায়ু দূষণ তেমন হতো না। এখন গরীবরা শুধু নয়, ধনীরাও ভূরি খায়। তবে গরু জবাই করতে আমি কখনো কাছে থাকতাম না। মায়া হতো। গরুর চিৎকার শুনলে কষ্ট পেতাম। বড়রা বলতেন, এমন করলে না-কী কোরবানি হবে না। তাই গরুর জবাই দেখা আমার কখনো হয় নি। তখন সবাই বলত আমার কলিজা না কী নরম। বড় হলে বলত, দূর্বল চিত্তের মানুষ আমি। এখনও তাই বলে।
মা কোরবানি ঈদের গোশত রান্না করতেন কাঁসার হাঁড়িতে। কষা মাংস দিয়ে মুড়ি খাওয়ার স্বাদ ছিল আরো মুখরোচক। আর শৈশবে কষা গোশত ধুইয়ে হাতে নিয়ে হেঁটেহেঁটে খাওয়ার মজাই ছিল আলাদা। তবে কলিজা হলে দারুণ মজা পেতাম। বাড়ির সব্বাই মিলে হৈ চৈ করতাম। আনন্দের ফল্গুধারা বয়ে যেত ঘরে ঘরে।
আর রাতে আমন চালের ভাত দিয়ে কোরবানির গোশতের স্বাদ ছিল আরো তৃপ্তিকর। সাথে থাকত কাঁচা পিয়াজ আর লেবু। মা-বাবা, ভাই-বোন মিলে কোরবানির গোশত-ভাত খেতাম পরম তৃপ্তিতে। সে স্বাদ,সে গন্ধ আজো অনুভূত হয়।
পরের দিন ভোরে মা বানাতেন আমন চালের চিতই পিঠা। রাতে চাল ভিজিয়ে রাখতেন। ভোর রাতে ওঠে শিলপাটায় চাল বাটতেন মা। খড়ির চুলায় বানাতেন চিতই পিঠা। আ হা রে! মায়ের হাতে ফোলাফোলা নরম, তুলতুলে ধূমায়িত চিতই পিঠা! সে কী ভোলার কথা? তার সাথে কোরবানির গোশত! গরম-গরম পিঠা আর গোশতের ঘ্রাণ আর স্বাদ? ঝালে আহ, হু করতাম বটে।
কিন্তু খাবারে এনে দিত আরো বৈচিত্র্যময়তা। এর সাথে কখনো থাকত চালের রুটি। গোশত আর চালের রুটির খাওয়ার স্বাদ যেন এখনো জিহ্বায় লেগে আছে। আর সিট রুটি? এটাও আমাদের অঞ্চলে গোশত দিয়ে খাওয়ার প্রচলন ছিল আবহমান কাল ধরে। দুপুরে ছিল সেই আমন চালের লেটকা খিচুরি! জমিনের মুশুরের ডালের সাথে আমন চালের দুস্তিটা ছিল মধুর। কোরবানির গোশত আর লেটকা খিচুরি? তার সাথে টাটকা লেবুর রস? পেটের চারকোণা পূর্ণ করে খেতাম। তবে ভূনা খিচুরি একেবারেই যে হতো না তা নয়। ভূনা খিচুরিও রান্না হতো অন্য একদিন। তবে পোলাও খাওয়ার রেওয়াজ এতটা ছিল না। যতটা ছিল চিতই, চালের রুটি আর লেটকা খিচুরির। আরো একটা মজার বিষয় ছিল,সবাই সবার বাসায় খেতাম। সত্যি বলতে কী, আয়োজনও করা হতো প্রচুর। অথিতি আপ্যায়নেও সবাই ছিল আন্তরিক ও নিবেদিত। তাই হৈ-হোল্লোর করে খাওয়াদাওয়া চলত সবার বাড়িতে সবার। প্রতিবেশী গরীবদের প্রতি সহমর্মিতা আর মহানুভবতায়ও ছিল সবাই সচেতন। আর এমনি আনন্দের ঈদ আয়োজন ছিল এক মহামিলন মেলার মহোৎসব। তবে মেয়ে জামাই থাকলে দাওয়াত করে খাওয়ানোর রেওয়াজ ছিল কড়াকড়ি। ফলে ঈদের পরের দিন চলত ঈদ আনন্দের দ্বিতীয় দৃশ্য। নানারকম পিঠাপুলি,সেমাই আর ফিরনি-পায়েসের সুঘ্রাণে বাড়িময় মৌ মৌ করত। পোলাও রান্না হতো গাওয়া ঘি দিয়ে। সাথে থাকত দেশি মুরগীর কোরমা। ইস্! পোলাওর সাথে কোরমার স্বাদপ্রিয়তা এখনো মনে পড়ে।
কোরবানির গোশত সংরক্ষণের তেমন ব্যবস্থা ছিল না। তবে মাকে দেখতাম হাঁড় ছাড়া গোশত লবন দিয়ে সেদ্ধ করতেন। পরের দিন আবারো সেদ্ধ করে পানিগুলো শুকাতেন। তারপর গুনায় গেঁথে বাঁশের আগায় ঝুলিয়ে রোদে শুকাতেন। কখনো ঘরের ভেতর চালের রুয়ার সাথে বেঁধে রাখতেন। রোদের তাপে শুকিয়ে যেত গোশতের শুঁটকী। এগুলো বর্ষায় একনাগাড়ে বৃষ্টি-বাদলার দিনে খাওয়া হতো। আগের দিন রাতে ভিজিয়ে রাখা হতো। সকালে একদম নরম হয়ে ফুলে যেত। শিলপাটায় থেতলে টুকোরো করা হতো। আলু কুচিকুচি করে একসাথে করে ভূনা হতো। সেটার স্বাদে ছিল ভিন্নতর এক অনাস্বাদিত স্বাদময় ।
ঈদের কয়েকদিন পর বাড়ি খালি হয়ে যেত। যার যার কর্মস্থলে চলে যেতেন সবাই। বিদায়ের ব্যথায় ব্যথিত থাকতাম কয়দিন। আবার সময়ই সব ভুলিয়ে দিত।
কোরবানি ঈদ আসে আজো। চলেও যায়। কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো পলেস্তারা পড়লেও একেবারে মুছে যায় নি। সময়ে,অবসরে ভিন্নমাত্রায় হাজির হয়। আর সেই স্মৃতিজাগানিয়া মুহূর্তগুলোর স্মৃতি রোমন্থনে থাকি বিভোর। আর ভাবি, সেই ঈদ আনন্দের,সেই সোনাঝরা মুহূর্তের মধুময় দিনগুলো আর কখনো কী ফিরে পাব?

 

আপনার মতামত লিখুন :