সবার মাঝে রাম বিরাজমান: বাবরি মসজিদের স্থানে রাম মন্দিরের ভিত্তি বসিয়ে মোদি

0
67

৪০ কেজি ওজনের রুপার মুদ্রা বসিয়ে ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোদ্ধার বহুল বিতর্কিত রাম মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কয়েক দশকের দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর গত বছর দেশটির সুপ্রিম কোর্ট অযোদ্ধার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির নির্মাণের অনুমতি দেয়ার পর বুধবার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি।

এনডিটিভি বলছে, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি বলেন, প্রত্যেকেই রাম… প্রত্যেকের মাঝেই রাম বিরাজমান। এটা আমার সৌভাগ্য যে রাম জন্মভূমি ট্রাস্ট এই অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমাকে ঐতিহাসিক এ মুহূর্তের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বহু দিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটল আজ। এত দিন তাঁবুতে মাথা গুঁজে ছিলেন রামলালা। এবার তার জন্য সুবিশাল মন্দির নির্মিত হবে। বহু শতক ধরে যে ভাঙা-গড়ার খেলা চলে আসছে, আজ রামজন্মভূমি তা থেকে মুক্ত হলো। সারায়ু নদীর তীরে সূচনা হলো স্বর্ণযুগের।’

আনন্দবাজার বলছে, ভারতের স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গেও আজকের দিনটির তুলনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সারাদেশ স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিল। মন্দিরের জন্যও অনেকে বলিদান দিয়েছেন। ১৫ আগস্ট যেমন স্বাধীনতার প্রতীক। আজকের দিনটি তেমনই ত্যাগ, সংকল্প ও সংঘর্ষের প্রতীক।’

শুধু ভারতেই নয়, গোটা পৃথিবীতে আজ রামের জয়ধ্বনি শোনা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন মোদি। তিনি বলেন, ‘আজ গোটা দেশ রামময়, রোমাঞ্চিত। পৃথিবীর সর্বত্র রামের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এই রামমন্দির আমাদের সংস্কৃতির আধুনিক প্রতীক। আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাবনার প্রতীক। সারা পৃথিবীর মানুষ এখানে আসবেন। এ মন্দিরের মাধ্যমে বর্তমানের সঙ্গে অতীতের যোগসূত্র স্থাপিত হবে।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাম আমাদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। সব কাজে রামই আমাদের প্রেরণা। আজ সারাদেশের মানুষ রামমন্দির নির্মাণে শরিক হয়েছেন। রামের চরিত্রের কেন্দ্রবিন্দু হলো সত্যপালন। জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে রাম আমাদের কাছে প্রেরণা নন। বহুর মধ্যে বৈচিত্র্যই ভারতের বৈশিষ্ট্য। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে তাই রামায়ণের ভিন্ন ভিন্ন গাথা রয়েছে। ভারতের বাইরেও বিভিন্ন দেশে রামায়ণ রয়েছে। সর্বত্রই রাম একইভাবে পূজনীয়।’

jagonews24

বুধবার দিল্লি থেকে লক্ষ্নৌ হয়ে অযোধ্যায় যান মোদি। পরে হনুমানগরি মন্দিরে যান তিনি। সেখান থেকে যান অযোদ্ধায়। এ সময় উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মোহন ভগবত ও অন্যরা তার সঙ্গে ছিলেন।

সোনা, রুপার ইট, মুদ্রা ও বারে রামমন্দিরের ভিত্তি

দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, মন্দিরের নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য সারাদেশ থেকে রামভক্তরা রুপা ও সোনার মুদ্রা, বার এবং ইট পাঠিয়েছেন। এসব মূল্যবান ধাতব মুদ্রা পাহারা দেয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, গত কয়েক বছর ধরে ভক্তদের পাঠানো দেবতা ‘শ্রী রাম’র নাম খোদাইকৃত ২ লাখের বেশি ইট মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে ব্যবহার করা হবে। প্রস্তাবিত মন্দিরের প্রধান নকশাকারী চন্দ্রকান্ত সম্পুরা দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টকে বলেন, ভারতের উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় ধাঁচের মন্দির নির্মাণশৈলী নাগারার অনুকরণে মন্দিরের কাঠামো নকশা করা হয়েছে।

মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রাথমিকভাবে দেবতাদের মূর্তি রাখা হয়েছে। মন্দিরের ভেতরে থাকবে বিশালাকারের তিনটি মেঝে। পাঁচটি গম্বুজ ও ৩৬৬টি স্তম্ভের ওপর গড়ে উঠবে তিনতলা বিশিষ্ট এই স্থাপনা। সম্পুরা বলেন, মন্দির আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন; তাদের সম্মানে একটি স্মৃতি প্রাচীর নির্মাণ করা হবে।

বিতর্কের আদ্যোপান্ত

অযোধ্যার রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদের ২ দশমিক ৭৭ একর বিতর্কিত জমির আইনি লড়াইয়ের শুরু হয় ১৯৫০ সালে। রামের ভক্ত গোপাল সিংহ বিশারদ বাবরি মসজিদকেই রামের জন্মভূমি দাবি করে সেখানে পূজার অধিকার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন।

পরমহংস রামচন্দ্র দাস সেখানে পূজার দাবি জানিয়ে মামলা করেন। ১৯৬১ সালে উত্তরপ্রদেশের সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড জমির অধিকার চেয়ে আদালতে যায়। ‘রামলালা বিরাজমান’ নিজেও মামলার পক্ষ হয়ে ওঠেন। এলাহাবাদ হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি দেবকীনন্দন আগারওয়ালের প্রধান দাবি, রামের জন্মভূমিই দেবতার চরিত্র পেয়েছে।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সব মামলা এলাহাবাদ হাইকোর্টে চলে আসে। ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল, সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখাড়া, রামলালার মধ্যে জমি সমান ভাগে করে দেয়া হোক। ফলে হিন্দুরা পায় জমির তিন ভাগের দু’ভাগ। মুসলিমরা এক ভাগ।

jagonews24

এর বিরুদ্ধে সব পক্ষই সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে। রামলালা বিরাজমানের আইনজীবীরা দাবি করেন, রামের জন্মভূমি দেবতাস্বরূপ। তার ভাগ হয় না। বিতর্কিত জমি মন্দিরের জন্য দেয়ার রায় ব্যাখ্যা করে গত বছরের ৯ নভেম্বর দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বলেন, আর্কিওলজি সার্ভে অব ইন্ডিয়া প্রমাণ পেয়েছে যে, মোঘল সম্রাট বাবরের ১৬ শতকের মসজিদ ফাঁকা জায়গায় নির্মাণ করা হয়নি।

দেবতা রামচন্দ্রের জম্মভূমির ওপর তৈরি করা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপর মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে বলে ধারণা দেশটির কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের। ১৯৯২ সালে হামলা চালিয়ে এই মসজিদ ধ্বংস করার পর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়। এতে প্রায় ২ হাজার মানুষ মারা যান।

মসজিদের স্থানে মন্দির নির্মাণের অনুমতি দিলেও ষোড়শ শতকের ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাকে আইনের পরপন্থী বলে রায়ে বলেছিলেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।

আপনার মতামত লিখুন :