নকল বাদী-আসামি সাজিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করলেন ভুয়া আইনজীবী

0
44

‘জাতীয় পরিচয়পত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক। নেই আইন পেশার সনদ। সাগর ঘোষ নামে কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির এক আইনজীবীর সনদ দাখিল করে করে নিজের নাম-পরিচয় গোপন রেখে গত দুই বছর ধরে কুমিল্লায় আইনপেশায় নিয়োজিত ছিলেন রাম কেশব দাস নামে এক প্রতারক।

এ সময়ে তার হাতে অনেক মামলা ছিল। নিয়েছেন সমিতি থেকে ভাতাও। দুটি ভিজিটিং কার্ডে রয়েছে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টসহ চার চেম্বারের ঠিকানা। ধর্ষণের একটি মামলার সূত্র ধরে প্রতারণার বিষয়টি সিআইডির নজরে আসে। এরপর এক মাস ধরে সপরিবারে লাপাত্তা এই আইনজীবী।

খোদ আদালত অঙ্গনে এমন ঘটনায় হতবাক অন্যান্য আইনজীবী। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এই ব্যক্তিকে সদস্য পদ দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটির গাফিলতি ছিল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় আদালত অঙ্গণে বেশ তোলপাড় চলছে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে প্রতারক রাম কেশব দাসের এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। দ্রুত এ প্রতারকের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় আইনজীবীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সাগর ঘোষ পরিচয়ে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগ দেন রাম কেশব দাস নামে এক আইনজীবী। সদস্য নম্বর ১৩০২। এরপর থেকে আদালত অঙ্গণে নিয়মিত বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা করে আসছিলেন। এ সময়ে সমিতি থেকে বিভিন্ন ভাতাও পেয়েছেন তিনি। প্রয়োগ করেছেন সদস্য হিসেবে ভোটাধিকারও। আইন পেশার সনদ না থাকলেও গত দুই বছর ধরে বীরদর্পে চালিয়েছেন স্বাভাবিক কার্যক্রম।

যেভাবে প্রতারণা ফাঁস হয়ে যায় :

আসামির যোগসাজশে ধর্ষণের একটি মামলা গত ৬ নভেম্বর কুমিল্লার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এ ভুয়া বাদী সাজিয়ে হাসিনা আক্তার নামে এক আইনজীবীর নাম ব্যবহার করে মামলা প্রত্যাহারসহ নিষ্পত্তির আবেদন করেন রাম কেশব দাস। এতে ধার্য তারিখের আগেই মামলাটি নিষ্পত্তি হয়ে যায়। পরে বাদীপক্ষের আইনজীবী নূর মোহাম্মদ বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে সংশ্লিষ্ট আদালতে রিট করেন।

চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি আদালতের বিচারক এমএ আউয়াল বিষয়টি তদন্তপূর্বক ১৫ মার্চের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় আদালত অঙ্গণে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং আইনজীবীর নামও প্রকাশ পেয়ে যায়। এ ঘটনায় আদালতের বিচারকের কাছে ৫০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখিতভাবে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন রাম কেশব দাস।

এদিকে, আদালতের নির্দেশ পেয়ে রাম কেশব দাসের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং কিশোরগঞ্জের দুটি ঠিকানায় অনুসন্ধান চালান সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা। উভয় ঠিকানা ভুয়া হলেও কিশোরগঞ্জ থেকে প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত হয় পুলিশ। বেরিয়ে আসে তার আসল পরিচয়।

কুমিল্লা সিআইডির পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অনুসন্ধানে রাম কেশব দাসের দুটি ঠিকানা ভুয়া পাওয়া যায়। গত ৫-৬ বছর আগে কিশোরগঞ্জ সদরের খড়মপট্টি এলাকায় ‘মুছা নীড়’ নামে এক বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন রাম কেশব। নাম-পরিচয় গোপন করে কুমিল্লায় এসে সাগর ঘোষ কেশব নামে আইনজীবী হয়ে যান। প্রকৃতপক্ষে সাগর ঘোষ নামে কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে একজন আইনজীবী রয়েছেন। রাম কেশব কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার দাসপাড়া গ্রামের অনিল চন্দ্র দাস ও সন্ধ্যা রানী দাস দম্পতির ছেলে।

পরিবার নিয়ে পালিয়েছেন রাম কেশব দাস :

সিআইডির তদন্তে পরিচয় উদঘাটন হওয়ার বিষয়টি টের পেয়ে সপরিবারে ভাড়া বাসা এবং চেম্বার ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন রাম কেশব দাস। তার দুটি ভিজিটিং কার্ডে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স বিল্ডিং হল রুম-১৬ এবং কুমিল্লার তিনটি নিয়ে চারটি চেম্বারের ঠিকানা রয়েছে। অপর তিনটি ঠিকানা হলো- আদালত প্রাঙ্গণে জেলা আইনজীবী সমিতির ভবনে ৩ নম্বর হল রুম, কোতোয়ালি জিআর অফিস কক্ষের সামনে কাশেম ভেন্ডার ও কোতোয়ালি মডেল থানার সামনে মেসার্স সাঈদ এন্টারপ্রাইজ।

খোদ আদালত অঙ্গণে প্রতারণার এমন ঘটনায় বিস্মিত কুমিল্লার আইনজীবীরা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় আদালত অঙ্গণে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য আশিকুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, আমি মনে করি সাহেদের চেয়েও ভয়ঙ্কর প্রতারক রাম কেশব দাস। তাকে এখানে যোগদানের সুযোগ যারা করে দিয়েছেন, তৎকালীন কমিটি এর দায় কোনোভাবে এড়াতে পারে না। গত দুই বছরে যেসব মামলা পরিচালনা করেছেন রাম কেশব দাস, এসব মামলার ভবিষ্যত কী? আর তার ক্লায়েন্টরা কোথায় যাবে এখন, এর জবাব কে দেবে? এই প্রতারকের কারণে কুমিল্লা বারের ঐতিহ্য ও আইন পেশার যে মর্যাদা এবং সুনাম নষ্ট হয়েছে এর দায় কে নেবে?

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু বলেন, এ ধরনের ভুয়া আইনজীবীর কারণে আদালতে এসে মানুষ হতাশায় ভোগে। আইনজীবী না হয়েও আরেকজনের পরিচিতি ব্যবহার করে কাজ করার কারণে এ মহৎ পেশাটি মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড যেন আর না ঘটে সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্কভাবে যাচাই-বাছাই করে আইনজীবী সমিতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, কেশব দাস কিভাবে যোগদান করেছেন, তার সিনিয়র কে, তাকে শনাক্ত কে করেছেন, কিশোরগঞ্জ থেকে কুমিল্লা বারে আসার বার কাউন্সিলের চিঠি কতটুকু সত্য তা তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে।

কিশোরগঞ্জের প্রকৃত আইনজীবী সাগর ঘোষ বলেন, একটি মামলার তদন্তে যাচাইকালে আমার নাম ব্যবহারের বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। এটা অবৈধ কাজ। কুমিল্লা বারে তৎকালীন সময়ে যারা নেতৃত্বে এবং দায়িত্বে ছিলেন তাদের যোগসাজশে এ ঘটনা ঘটেছে। এটা কুমিল্লা বারের ব্যর্থতা।

কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শাহ আজিজুল হক বলেন, কেশব দাস এলএলবি পাস করেছেন এমন পরিচয়ে কিশোরগঞ্জ আদালতে ঘোরাফেরা করতেন। পরবর্তীতে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করলে এলএলবি পাস নয়- এটি প্রমাণিত হয়। এরপরই তাকে কিশোরগঞ্জ থেকে বিতাড়িত করা হয়।

কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির তৎকালীন কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, প্রত্যেকটা কাগজ দেখে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল। এতে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমারও দায় আছে। কিন্তু একজন আইনজীবী এমন কাজ করবেন এটা ভাবিনি। বার কাউন্সিল থেকে চিঠিসহ সব কাগজপত্র নিয়ে এসেছেন, তাই বিশ্বাস থেকে তাকে সমিতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। যে কারণে যাচাই করা হয়নি। আমরা যদি তাৎক্ষণিক যাচাই করতাম, তাহলে এমন ভুল হতো না। অতীতে কোনো আইনজীবী এমন কাজ করেননি।

কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সামছুর রহমান ফারুক বলেন, বিষয়টি প্রশাসনে তুমুল নাড়া দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, এজন্য আমরা সতর্ক থাকব। ঘটনাটি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নো হবে।

আপনার মতামত লিখুন :