শরণার্থী ক্যাম্প থেকে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন : অবিশ্বাস্য এক গল্প

0
36

আলফনসো ডেভিস। বার্সেলোনা সভাপতি হোসে মারিয়া বার্তেম্যু হয়তো এখন আক্ষেপে নিজের মাথার চুল ছিঁড়ছেন। কানাডিয়ান ডিফেন্ডার, খেলেন যুক্তরাষ্ট্রের এমএলএস লিগে। এই ফুটবলারকে কেনার প্রস্তাব পাওয়ার পর নাক সিঁটকেছিলেন তিনি, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

সেই আলফনসো ডেভিসের হাতেই দুরমুস হয়েছিল বার্সা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে যে ম্যাচে বায়ার্নের কাছে ৮-২ গোলের লজ্জায় ডুবেছিল বার্সা, সেই ম্যাচে অসাধারণ খেলেছিলেন ডেভিস। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে নেলসন সেমেদোকে বোকা বানিয়ে জসুয়া কিমিচকে দিয়ে যে গোলটি তিনি করিয়েছেন, সেটা দীর্ঘদিন চোখে লেগে থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের।

বার্সা প্রত্যাখ্যান করলেও ২০১৯ সালে আলফনসো ডেভিসকে কিনে নিয়েছিল বায়ার্ন মিউনিখ। দুরন্ত গতির এই লেফট ব্যাক যেন বায়ার্নের ফুটবল দলে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পিএসজির বিপক্ষেও অসাধারণ খেলেছিলেন তিনি।

বয়স তার মাত্র ১৯। এই বয়সেই ফুটবল দুনিয়া কাঁপানোর বার্তা দিয়ে দিলেন তিনি। অথচ জাতিতে নিগ্রো এবং চিতার মতো ক্ষিপ্র এই ফুটবলারের ইউরোপের শীর্ষে উঠে আসার গল্পটা কিন্তু এত সহজ নয়।

jagonews24

ফুল বিছানো ছিল না তার এ পর্যন্ত উঠে আসার পেছনে। প্রতিটি পদক্ষেপেই তিনি পাড়ি দিয়ে এসেছেন কাঁটার পাহাড়। আলফনসো ডেভিস জন্ম নিয়েছিলেন ঘানার একটি শরণার্থী ক্যাম্পে। তার মা-বাবা জাতিতে লাইবেরিয়ান।

আলফনসো ডেভিসের বাবা দেবেয়াহ এবং মা ভিক্টোরিয়া তার জন্মের আগেই লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়া ত্যাগ করেছিলেন, সেখানে গৃহযুদ্ধের দাবানল জ্বলে ওঠার পর। আশ্রয় নিয়েছিলেন ঘানার শরণার্থী ক্যাম্পে।

ডেভিসের বাবা দেবেয়াহ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সেখানে (মনরোভিয়া) বেঁচে থাকতে হলে আপনাতে হাতে অস্ত্র তুলে নিতেই হবে। না হলে উপায় নেই। অথচ, আমাদের মোটেও ইচ্ছা ছিল না হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে মানুষের বুকে গুলি করতে। পুরো জায়গাটা ছিল ভয়ানক। খাবার খেতেও আপনাতে যেতে হতো লাশের সারির ওপর দিয়ে।’

দেবেয়াহ এবং ভিক্টোরিয়া ঘানার শরণার্থী ক্যাম্পের জীবন শেষ করেন দেশটির রাজধানী আক্রার পশ্চিমাংশে অবস্থিত বুদুবুরাম থেকে। শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভিক্টোরিয়া বলেন, ‘সেখানে আমাদের জীবনটা যেন একটি কন্টেইনারে বন্দীর মত। যে কন্টেইনারের তালা বন্ধ করে চাবিটা কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল। সেখান থেকে আর বের হওয়ার কোনো উপায় ছিল না।’

সৌভাগ্য আলফনসো ডেভিসের। তার মা-বাবা কোনোভাবে সেই শরণার্থী শিবিরের বন্দীদশা থেকে বের হতে পেরেছিলেন এবং পাড়ি জমিয়েছেন কানাডায়। দেশটির এডমন্টনে কিভাবে দেবেয়াহ এবং তার পরিবার গেলো, সে অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এ সম্পর্কে আসলে কিছুই জানি না। এমনকি এখানকার কাউকে চিনি না। শুধু বলতে পারতাম, আমি ভালো আছি।’

২০০৬ সালে এডমন্টনে স্কুলে যাওয়া শুরু করেন ডেভিস। একই সঙ্গে সেখানকার স্কুল ফুটবলে নাম লেখান এবং খুব অল্পদিনেই নিজের জাত চেনাতে সক্ষম হন। এডমন্টনে ফ্রি ফুটি নামে একটি সংগঠন প্রায় চার হাজার বাস্তুহারা কিংবা বস্তির শিশুকে ফুটবল খেলা শেখানোর দায়িত্ব নিয়েছিল পুরোপুরি ফ্রি’তে।

jagonews24

ফ্রি ফুটির প্রধান নির্বাহী টিম অ্যাডামস বলেন, ‘আলফনসো আসলে একটি উদাহরণ তৈরি করেছিল। সবকিছু ঠিক থাকলে যে কোনো শিশু ভালোভাবে বেড়ে ওঠে এবং তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটাতে পারে, সেটার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সে। যদিও এই শিশুটির মধ্যে আমরা বিশেষ কিছু দেখেছিলাম।’

এই টিম অ্যাডামসই ডেভিসের জন্য সেন্ট নিকোলাস ক্যাথলিক স্কুলের ফুটবল শিক্ষক মার্কো বোসিওর কাছে অনুরোধ করেন, সেখানকার ফুটবল একাডেমিতে তাকে প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেয়ার জন্য। বোসিও বলেন, ‘অনেক উঁচুতে যাওয়ার জন্য আমরা ডেভিসের মধ্যে খুব শক্তিশালী মানসিকতা দেখতে পেয়েছিলাম। আমি বিষয়টা ফোনে জানিয়েছিলাম (হোয়াইটক্যাপসকে)। তারা ডেভিসকে ট্রায়ালের জন্য ডাকে এবং সেখানে তারা দেখে, যেটা আমি ডেভিসের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম।’

১৪ বছর বয়সেই ডেভিস মা-বাবাকে ছেড়ে ১ হাজার কিলোমিটার দুরে ভ্যাঙ্কুবারে চলে যান। এমনকি বিষয়টা তার মা-বাবাও জানতেন না। তার মা ভিক্টোরিয়া বলেন, ‘আমি খুব ভয়ে ছিলাম। আমি জানতাম কিছু তরুণ মানুষ কিছু একটা করছে। কী করছে তা জানতাম না। কিন্তু আমি চাইতাম না, ডেভিস সেটা করুক। আমি চেয়েছিলাম, তার বয়স ১৬ কিংবা ১৭ হোক। এরপর সে ওসব কিছুতে জড়াক। কিন্তু সে আমাকে ওয়াদা দিয়েছিল, সে কখনও বদলে যাবে না। আগের মতই থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত সে আমাদেরকে গর্বিত করেছে।’

মাত্র ১৫ বছর ৮ মাস বয়সেই হোয়াইটক্যাপের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল লিগ এমএলএসে অভিষেক হয় ডেভিসের। সে সঙ্গে একটি রেকর্ডও গড়ে ফেলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া ফুটবল ইতিহাসে তিনিই প্রথম ফুটবলার, যার জন্ম হয়েছিল একবিংশ শতাব্দীতে। এর আগে এমএলএস লিগে যারা খেলেছিলেন, তাদের সবারই জন্ম ২০০০ সালের আগে।

২০১৭ সালে কানাডার নাগরকিত্ব লাভ করেন আলফননো ডেভিস। একইসঙ্গে কানাডা জাতীয় দলে খেলার উপযুক্ত হয়ে যান তিনি। এর এক সপ্তাহ পরই কানাডা দলে ডাক পান তিনি। ২০১৭ সালের গোল্ড কাপে কানাডা জাতীয় দলে উইঙ্গার হিসেবে খেলেন এবং ফ্রেঞ্চ গায়ানার বিপক্ষে গোল করে কানাডিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে স্কোর করার রেকর্ড গড়েন তিনি।

jagonews24

২০১৮ সালেই বায়ার্ন মিউনিখ ডেভিসকে ডেকে নেয় এবং মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি গিয়ে যোগ দেন জার্মান জায়ান্টদের শিবিরে। বায়ার্নের স্পোর্টিং ডিরেক্টর হাসান সালিহামিডজিক বলেন, ‘আমরা তাকে দলে এনেছি, কারণ তাকে দেখেছিলাম। তাকে দেশে আমাদের মনে হয়েছে, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সে অন্যতম সেরা একজন ফুটবলার।’

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রথম বায়ার্নের জার্সিতে মাঠে নামেন তিনি। এরপরই ইউরোপিয়ান ফুটবলে নিজের নামকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত করে তুলছেন আলফনসো ডেভিস।

মূলতঃ তিনি একজন উইঙ্গার। কিন্তু ১৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার নিজেকে পরিণত করেছেন অন্যতম সেরা একজন লেফট ব্যাক হিসেবে। দারুণ গতি এবং অসাধারণ ড্রিবলিং ক্ষমতা তার। বার্সেলোনাই যেন টের পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। বায়ার্ন কোচ হান্সি ফ্লিক বলেন, ‘তার উন্নতিটা অসাধারণ। তাকে আমরা দলে নিয়ে এসেছিলাম একজন উইঙ্গার হিসেবে। কিন্তু দেখলাম সে ফুল ব্যাক হিসেবে অসাধারণ খেলছে।’

বায়ার্নের তারকা ফুটবলার থমাস মুলার বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত ডেভিসের মত এমন কোনো ফুটবলার পাইনি। তার মত এত ট্যালেন্ট কোনো ফুটবলার কিন্তু আপনি দেখতে পাবেন না। আমরা তার কাছ থেকে আরও অনেক বেশি আশা করতে পারি। কারণ সে দিন দিন উন্নতি করছে।’

শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব ডেভিস। চারিত্রিক মাধুর্য দিয়ে এরই মধ্যে তিনি বায়ার্নের বাইরের মানুষদের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। বায়ার্ন চেয়ারম্যান কার্ল হেইঞ্জ রুমেনিগে বলেন, ‘ডেভিস শুধু খেলা দিয়ে আমাদের সমর্থকদের মুগ্ধই করেনি, তার চেয়ে বেশি মাঠের বাইরের কর্মকাণ্ড দিয়ে মুগ্ধ করেছেন।’

ডেভিসের মা তার ছেলেকে বলেন, ‘তুমি হয়তো সেরাদের সেরা হবে একদিন। কিন্তু তুমি যদি অন্য মানুষদের সম্মান করতে না শেখো, তাহলে কেউ তোমাকে পছন্দ করবে না।’

সূত্র : মার্কা থেকে অনুদিত

আপনার মতামত লিখুন :