সমুদ্রের ঢেউ দেখতে পারকি চরে একদিন

0
109

সমুদ্রের ঢেউ বেশির ভাগ মানুষেরই মন ভালো করে দেয়। অনেকে সেই পানিতে গা ভাসাতে ভালোবাসেন। নোনাজলের আলাদা একটা খোসবু আছে, আলাদা ধরন আছে, আলাদা টান আছে যেখানে প্রাণ বাঁধা পড়ে যায়। দিল আটকে যায়। মন স্থির হয়ে যায়। হৃদয় উথলে ওঠে। পাওয়ার নেশায় মানুষ ভাষা হারিয়েও আশায় বুক বাঁধে। এখানে আসলে অনেক কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু কী পেয়েছে তা বলা যায় না। আসলে অনুভূতির চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলে মানুষ শব্দ খুঁজে পায় না। ওখানে অনাবিল আনন্দের স্রোতে ভেসে যাওয়া যায়। ওখানে অকারণ পুলকে ক্ষণিক সময়ে চিরস্থায়ী গান গাওয়া যায়।

এজন্যই সৌন্দর্যপিপাসু মানুষদের বারবার যেতে হয় নোনা জলের ঘ্রাণ নিতে। এ ঘ্রাণে কেমন যেন একটা মায়াবী মোহ লেগে থাকে। এ মোহ থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। বেরিয়ে আসলে মন পোড়ে। স্মৃতি লেগে থাকে মনের খাতার পাতায়। এ স্মৃতি কখনো মোছাও যায় না। এ স্মৃতির রেশ ধরেই মনকে সজীব করার তাগাদায় মানুষ সমুদ্রে যাবার জন্য বারংবার উৎসুক হয়। এখানে সময় দ্রুত কেটে যায়। এখানে জীবনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায়। এখানে পুরাতন জীর্ণতাকে ফেলে দেয়া যায়। এখানে মনের কলুষতাকে বিষর্জন দেয়া যায়। সকল ভুল-ভ্রান্তি-মিথ্যাকে এ জলে স্নান করিয়ে শুদ্ধ করে তোলা যায়। মানুষের রেচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমুদ্রের রেচন প্রক্রিয়ার এখানেই বড় তফাৎ।

মানুষ যত সুগন্ধি দ্রব্যই আহার করুক না কেন তার রেচন প্রক্রিয়া সেটাকে মারাত্মক দুর্গন্ধে রূপান্তর করে আর সমুদ্রকে যত দুর্গন্ধযুক্ত খাবারই দেয়া হোক সে তার রেচনা প্রক্রিয়ায় সেটিকে পরিবর্তন করে দারুণ ঘ্রাণে রূপান্তর করে ছড়িয়ে দেয় জলবায়ুতে। একটা সুগন্ধকে দুর্গন্ধ বানায় অন্যটা দুর্গন্ধকে সুগন্ধ। নোনা জলে এ কারণেই স্বপ্ন বোনা যায়। এটা এমন এক মোহময় স্থান যেখানে আসলে নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়, মানুষ ছোট হয়ে যায় নিজের কাছে নিজে। তখন অহঙ্কার মননের খিড়কির দরজা দিয়ে লোকান্তরিত হয়। এখানে আসলে মানব জীবনকে হাতে নিয়ে দেখা যায়। এখানে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। থাকে না রাজায়-প্রজায় বিভেদ। শাসক, শোষক আর শোষিত সবাই এক কাতারে চলে আসে। নির্যাতিত আর নির্যাতনকারী সবার সঙ্গে সমুদ্র সম আচরণ করে। তাই এখান থেকেই মানবতার শিক্ষা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে নেয়া যায়। এখানেই সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির পরিকল্পনা করা যায়। এই নোনাজলে আবাহন করেই নতুন স্বপ্ন বোনা যায়। যে যার মানস অনুযায়ী নোনাজলকে ব্যাখ্যা করতে পারে।

সমুদ্রে মানুষ যায়, ক্রমাগতই যায়। আসলে যায় না, তাকে যেতে হয়। লৌকিক দাবিকে অস্বীকার করে মননের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যেতে হয়। অবচেতন সত্তার টানে যেতে হয়। অজানা আহ্বানে যেতে হয়। সুদূরের হাতছানি পেয়ে যেতে হয়। সমুদ্রে যেতে হয় একাকী। অনেককে নিয়ে গেলেও একা হয়ে যেতে হয়। সামষ্টিকতা নিয়ে সমুদ্র ভোগ করা যায়, উপভোগ করা যায় না। ক্ষেত্রবিশেষে ভোগের চেয়ে উপভোগ বড় হয়ে ওঠে। এখানে এসে বাংলা ব্যাকরণের চূড়ান্ত ঐশ্বর্য দেখানো যায়। ‘উপ’ উপসর্গ শুধু সংকোচন বা ছোটই করে না কখনো কখনো অর্থের প্রসারণও করে।

মডেল: নাজনীন সুলতানা তুলি

 

আপনার মতামত লিখুন :