বাঘ-সিংহ কুপোকাত মনিরা মিতা

0
30

বনের শেষ প্রান্তে ছোট একটি হরিণ শাবক শুয়ে আছে। সে এইমাত্র দুনিয়াতে এসেছে। পাশেই তার অসুস্থ মা শুয়ে আছে। মা তার সুন্দর ছানাটার নাম দেয় কাজল। মা কাজলকে কোলে নিয়ে আদর করে। ওকে দুধ পান করায়। কিন্তু মা হরিণ খুব দুর্বল। সে জানে না যে এই অসুস্থ শরীরে আর কতক্ষণ পৃথিবীতে থাকবে। তার তুলতুলে ছানাকে কার কাছে রেখে যাবে তা নিয়ে ভাবনায় পড়ে গেল সে। এমন সময় ওদিক দিয়ে যাচ্ছিল এক মা কুকুর আর তার তিন ছানা। নাদুস-নুদুস ছানাগুলো নেচে নেচে মায়ের পিছু পিছু হাঁটছিল। মা হরিণটি অনেক অনুনয় করে তাদের কাছে ডাকল। তারপর নিজের শাবকটিকে দেখে রাখার অনুরোধ করতে করতে মারা গেল। কুকুরটি হরিণকে কথা দিয়েছে তার শাবকের খেয়াল রাখবে। কিন্তু এই বনে এক হিংস্র বাঘ ও সিংহ আছে তা সে জানে। কাজলকে একা পেলে বাঘ-সিংহ তাকে খেয়ে ফেলবে। সুতরাং কুকুরটি তার বাচ্চাদের নিয়ে বনের পাশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
কাজল নতুন মায়ের কাছেই থাকে। অন্য ভাইদের মতো সেও নতুন মায়ের দুধ খেয়ে বড় হচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে এদিক ওদিক গিয়ে একটু ঘাস খেয়ে আসে। মা বলেছে খুব সাবধান থাকতে। বিপদে পড়লে বুদ্ধি কাজে লাগাতে। একদিন কাজল ঘাস খেয়ে নদীর ধারে পানি খেতে গিয়েছে। আচমকা সে দেখে মস্ত বাঘ তাকে ধরার জন্য ঘাপটি মেরে বসে আছে। কাজল দেখল মহাবিপদ। হঠাৎ তার মাথায় বুদ্ধি এল। চিৎকার করে বলতে লাগল- ‘বাঘ মামা, তুমি কোথায়? তাড়াতাড়ি আমার কাছে এসো।’
বাঘের কানে একথা পৌঁছাতেই হুঙ্কার দিয়ে সামনে এল। কাজল মাথা নিচু করে বলল, সালাম, রাজামশাই।’
কাজলের ব্যবহারে বাঘ খুব খুশি হল। কাজল বলল, ‘মামা, আপনি এই বনের মহান রাজা। অথচ দুষ্টুরা বলে সিংহ হল বনের রাজা। আপনি নাকি তার সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হবেন।’
‘কী এত্ত বড় কথা! আমি সিংহকে ছাড়ব না।’
‘রাজামশাই, আজ বিকেল পাঁচটায় তাহলে বনের শেষ প্রান্তে আপনার আর সিংহের যুদ্ধ হয়ে যাক। যুদ্ধে আপনিই জিতবেন আর সিংহ মরবে। তখন আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী আর কেউ থাকবে না।’
‘ঠিক বলেছিস। যা সিংহকে গিয়ে বল আমি ওকে যুদ্ধে ডেকেছি। আজ বাঘে-সিংহের লড়াই হবে।’
এবার কাজল চলে গেল সিংহের কাছে।
বাঘের সব কথা সিংহের কাছে গিয়ে বলল। সব শুনে গর্জন করে উঠল সিংহ।
‘বাঘের এত্ত বড় সাহস যে আমাকে যুদ্ধে ডাকে! ঠিক আছে আমি আসব। দেখব কে নিজেকে সেরা বলে প্রমাণ করতে পারে। কাজল বলল, ‘মামা, আমি জানি যুদ্ধে আপনিই জিতবেন। ঠিক পাঁচটায় চলে আসবেন।’
কাজল এবার গেল হাতির কাছে। তাকে বলল ‘এই বনের বাঘ-সিংহ দুজনকেই মারার ব্যবস্থা করেছি। তোমার সাহায্য চাই।’
সব শুনে হাতি রাজি হল।
এবার কাজল গেল পুরো জঙ্গলের পশু পাখিদের নিমন্ত্রণ দিতে।
ঠিক পাঁচটায় বাঘ-সিংহ দুজনেই গজগজ করতে করতে হাজির হল।
শুরু হল তুমুল লড়াই।
কেউ হারার পাত্র না। ওদিকে কাজল বলতে লাগল ‘আরও জোরে মারো মামা, আরো জোরে।’
বাঘ ভাবল তাকে বলছে আর সিংহ ভাবল তাকে বলছে! একসময় যুদ্ধ করতে করতে দুজনেই ক্লান্ত হয়ে গেল। কাজল চিৎকার করে বলল, ‘মামা লেজে পেঁচিয়ে আছাড় মারো। কাজলের কথামতো দুজনেই দুজনকে লেজে প্যাঁচাতে চাইল। কিন্তু সিংহের তো লেজ ছোট সুতরাং বাঘ-সিংহকে আছাড় মেরে কোমর ভেঙে দিল। তারপর সে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল।
এমন সময় কাজল হাতিকে ইশারা করল। হাতি তার বিশাল দেহ নিয়ে থপথপ করে এগিয়ে গেল। বাঘ কিছু বোঝার আগেই শুঁড়ে পেঁচিয়ে মারল জোরে আছাড়। ওমনি বাঘ কুপোকাত। আর কোমর ভাঙা সিংহকে পিষে ফেলল পায়ের নিচে। সব পশুপাখি হাতে তালি দিল। অত্যাচারী বাঘ-সিংহ থেকে তারা মুক্তি পেল।
সবাই কাজলের বুদ্ধির প্রশংসা করল। কাজল কিন্তু মুচকি হেসে তার নতুন মায়ের দিকে তাকাল। যে হাসির মানে সে আর তার মা-ই জানে!

আপনার মতামত লিখুন :