আশুরায় মুসলমানের করণীয় ও বর্জনীয়

0
40

মহররমের ১০ তারিখ আশুরা। ফজিলত ও মর্যাদার এ দিনে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে রোজা রেখেছেন, সাহাবায়ে কেরামকে রোজা রাখতে বলেছেন। এ দিনের রোজা রাখতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলেছেন। রোজার ফজিলত বর্ণনা করেছেন। আশুরায় মুমিন মুসলমানের রয়েছে বিশেষ করণীয়। আবার রয়েছে বেশি কিছু বর্জনীয়।

মহররমে করণীয়
মর্যাদা ও সম্মানের মাস মহররম। কুরআনে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত চার মাসের একটি। এ মাসের করণীয় ও ফজিলত সম্পর্কে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছেন বেশকিছু নির্দেশনা। হাদিসে এসেছে-
– হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করে ইয়াহুদিদের আশুরার দিন রোজা পালনরত দেখতে পেলেন। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কোন দিনের রোজা পালন করছ? তারা বলল, এ মহান দিনে আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালাম ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউন ও তার ক্বওমকে ডুবিয়ে দিয়েছেন। এরপর মুসা আলাইহিস সালাম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার লক্ষ্যে এ দিনে রোজা পালন করেছেন। আমরাও এ দিনে রোজা পালন করছি। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আমরা তো তোমাদের থেকে মুসা আলাইহিস সালামের অধিক নিকটবর্তী এবং হকদার। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা পালন করলেন এবং রোজা পালন করার জন্য সবাইকে নির্দেশ দিলেন।’ (মুসলিম)

– হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, জাহেলি যুগে কুরাইশরা আশুরার রোজা পালন করত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তা পালন করতেন। মদিনায় হিজরতের পরও তিনি পালন করেছেন এবং লোকদের তা পালন করতে বলেছেন। কিন্তু (২য় হিজরি সনে) যখন রমজান মাসের রোজা ফরজ হলো, তখন তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছা করো আশুরার রোজা পালন কর এবং যে ব্যক্তি ইচ্ছা করো তা পরিত্যাগ কর।’ (বুখারি)

– হজরত উবায়দুল্লাহ ইবনে আবু ইয়াজিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আশুরার দিনে রোজা পালন করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার পর তিনি বললেন, এ দিন ব্যতীত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো দিনকে অন্য দিনের তুলনায় উত্তম মনে করে সেদিনে রোজা পালন করেছেন বলে আমার জানা নেই। অনুরূপভাবে রমজান ব্যতীত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো মাসকে অন্য মাসের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করে রোজা পালন করেছেন বলেও আমার জানা নেই।’ (মুসলিম)

– হজরত মুআবিয়াহ ইবনু আবি সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু যে বছর হজ করেছিলেন, সে বছর হুমাইদ ইবনে আব্দুর রহমান তাকে আশুরার দিন মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন-
‘হে মদিনাবাসী! তোমাদের আলিমগণ কোথায়? আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, এটি আশুরার দিন। আল্লাহ তোমাদের ওপর এ দিন রোজা রাখা ফরজ করেননি। তবে আমি রোজা রেখেছি। তাই যার ইচ্ছা সে তা পালন করুক আর যার ইচ্ছা সে তা পালন না করুক।’ (বুখারি)

– হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আশুরার দিন রোজা পালন করেন এবং লোকদের রোজা পালনের নির্দেশ দেন, তখন সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ইহুদি ও খ্রিস্টানরা এ দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা (মহররমের) নবম তারিখেও রোজা পালন করব। বর্ণনাকারী বলেন, এখনো আগামী বছর আসেনি, এমতাবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন।’ (মুসলিম)

অতএব দশম তারিখের আগে একদিন অথবা পরে একদিন যোগ করে দুদিন রোজা রাখা হলো উত্তম। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা আশুরার রোজা রাখো ইয়াহুদি সম্প্রদায়ের বিপরীত কর এবং দশম তারিখের আগে একদিন অথবা পরে একদিন মিলিয়ে রোজা রাখ।’ (ইবনে খুজায়মা)

আশুরায় বর্জনীয়
মহররমের ১০ তারিখ ঐতিহাসিক আশুরায় এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা নেই। অথবা ভিন্নধর্মীয়দের কোনো অনুষ্ঠানের সঙ্গে মিলে যায়। সুতরাং আশুরায় এ বিষয়গুলো বর্জন করে চলা জরুরি। তাহলো-
– মহররমকে শোক, মাতম, দুশ্চিন্তা ও দুঃখের মাস মনে করা।
– নারীদের সৌন্দর্য চর্চা থেকে বিরত থাকা।
– শোক পালনের উদ্দেশ্যে রোজা রাখা।
– হজরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর নামে প্রতীকী কবর বানিয়ে তাজিয়া মিছিল করা।
– প্রতীকী কবরে হজরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু আসেন বলে বিশ্বাস করা।
– এ প্রতীকী কবরকে সালাম করা কিংবা তাতে মাথা নত করা, সিজদা করা ও তার কাছে কিছু চাওয়া।
– শোক পালনের নামে বুক চাপড়ানো কিংবা জামা-কাপড় ছেঁড়া।
– হায় হোসেন! হায় হোসেন! বলে মাতম করা।
– লাঠি, তীর, বল্লম নিয়ে নিজের শরীরে আঘাত করে রক্তাক্ত করা বা যুদ্ধের মহড়া দেয়া।
– হজরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর নামে কেক বানিয়ে বরকতের কেক মনে করা।
– হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাসহ সাহাবাদের গালি দেয়া।
– শোক পালনের নামে অযথা টাকা-পয়সা নষ্ট করা।

এ দিন রোজা পালন, আহলে বাইত তথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার-পরিজনের জন্য বিশেষ দোয়া এবং সম্ভব হলে নিজ নিজ ঘরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উত্তম খাবার খাওয়া যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে উল্লেখিত করণীয় ও বর্জনীয়গুলো পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপনার মতামত লিখুন :