মসজিদে এসি বিস্ফোরণে মুয়াজ্জিনসহ দগ্ধ ১১ জনের মৃত্যু : কান্না আর আহাজারি ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের কমিটি : ডিসি এসপি ও ইউএনওর ঘটনাস্থল পরিদর্শন

0
85

নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকায় বায়তুস সালাত জামে মসজিদে এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। মৃতের তালিকায় রয়েছেন মসজিদের মুয়াজ্জিনও। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশের পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া এ তথ্য জানান।

এ ঘটনায় শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে প্রথম মৃত্যু হয় জুয়েল নামের এক শিশুর। এরপর রাতে ও সকালে বাকিদের মৃত্যু হয়।মৃতরা হলেন রিফাত, জোবায়ের, হুমায়ূন কবির, মোস্তফা কামাল, ইব্রাহিম, সাব্বির, দেলোয়ার হোসেন, জুয়েল, জামাল, জুনায়েদ এবং কুদ্দুস বেপারি। উল্লেখ্য, শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিমতল্লা এলাকার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এসি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে মসজিদের ভেতরে থাকা প্রায় ৫০ জনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হুড়োহুড়ি করে বের হওয়ার চেষ্টা করেন তারা। তাদের মধ্যে দগ্ধ অবস্থায় ৩৭ জনকে উদ্ধার করে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

ভর্তির পর ডা. সামন্ত লাল সেন জানিয়েছিলেন, এ পর্যন্ত ৩৭ মুসল্লিকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হ‌য়ে‌ছে। তা‌দের সবারই ডিপ বার্ন রয়ে‌ছে। ত‌বে শতাংশের হিসেবে কোন রোগীর কতটুকু বার্ন হ‌য়ে‌ছে তা তাৎক্ষ‌ণিক বলা যা‌চ্ছে না। প্রাথ‌মিকভা‌বে বলা যায়, কেউ শঙ্কামুক্ত নয়।

বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এয়ারকন্ডিশন (এসি) বিস্ফোরণে আহতদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি রাতে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নিয়ে এ নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম প্রধান এ তথ্য জানিয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপস) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমানকে প্রধান করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি একসঙ্গে কেন ছয়টি এসিই বিস্ফোরিত হয়েছে তা তদন্ত করে দেখবে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, মসজিদের মেঝের নিচে তিতাস গ্যাসের একটি লাইন রয়েছে। মসজিদের ভেতর গ্যাস জমে এই বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে৷ তবে বিস্ফোরণের সঠিক কারণ জানতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিবে৷

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, বিস্ফোরণের খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ঘটনাস্থল থেকে দগ্ধদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। মসজিদে ছয়টি এসি ছিল। প্রাথমিকভাবে ছয়টি এসিই বিস্ফোরিত হয়েছে বলে মনে হয়েছে। কেন ছয়টি এসি বিস্ফোরিত হলো তা তদন্তে কমিটি করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন জানান, এশার নামাজের শেষ সময় এয়ারকন্ডিশনের গ্যাসের লিকেজ হয়ে এ বিস্ফোরণ ঘটে। মসজিদের ফ্লোরের নিচ দিয়ে এয়ারকন্ডিশনের পাইপের সংযোগ ছিল। পাইপ লিক করে বুদবুদ আকারে গ্যাস বের হচ্ছিল। দরজা জানালা বন্ধ থাকায় কেউ হয়তো ইলেকট্রিক লাইনের কোনো সুইচ চালু করতে গিয়ে বিদ্যুৎ স্পার্ক হয়ে বিস্ফোরণটি ঘটে। এ ঘটনায় অর্ধশতাধিক আহত হয় বলে জানান তিনি।

এদিকে খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে উপস্থিত হন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন। পরে তিনি তল্লায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করেছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাহিদা বারিক। তাঁরা বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রয়োজনীয় সব রকম প্রস্তুতি ও ব্যাবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন এবং আহতদের সুচিকিৎসার দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কে নির্দেশ দিয়েছেন।

n.gonj

প্রত্যক্ষদর্শী তল্লা এলাকার বাসিন্দা মো. রতন বলেন, এশার নামাজ প্রায় শেষ দিকে তখন বিস্ফোরণের আওয়াজ পাই। বের হয়ে দেখি ভেতরে আগুন জ্বলছে। সে সময় দেখি সবাই বের হয়ে বাইরে বৃষ্টিতে জমে থাকা রাস্তার পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছে। চেহারার অবস্থা এতটা খারাপ ছিল যে কাউকে চেনা যাচ্ছিল না। সবাইকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে আলাপকালে নাসিমা আক্তারের বাবা জানান, মেয়েকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন বটে তবে রাতে এক ঝলক মেয়ের জামাইয়ের অগ্নিদগ্ধ শরীর দেখে আঁতকে উঠেছেন। ঝলসানো শরীর, চোখ মুখ ফুলে গেছে। প্রথমে চিনতেই পারছিলেন না নিজের মেয়ের স্বামীকে। শুধু নাসিমা আক্তার নন, শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের গেটের বাইরে রাত থেকে কেঁদে চলেছেন অগ্নিদগ্ধদের স্বজনরা। হাসপাতালে রোগীকে একনজর দেখতে মাত্র একজনকে সুযোগ দেয়া হয় বিধায় ঘনিষ্ঠজনরাও চোখে দেখা দেখার সুযোগ পাননি নিজের স্বজনকে।

ফলে স্ত্রী স্বামীর জন্য, বাবা ছেলের জন্য, বোন ভাইয়ের জন্য কেঁদেই চলেছেন। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দিলেও শারীরিক অবস্থা সবারই সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন। ফলে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত পরিবারগুলো গত রাত থেকে নাওয়া-খাওয়া ভুলে হাসপাতালের গেটের বাইরে একটু সুখবর শোনার অপেক্ষা করছেন।

 

আপনার মতামত লিখুন :