সালমান শাহকে হারানোর ২৪ বছর আজ

0
45

ঢাকাই সিনেমার নায়কদের নিয়ে কথা বলতে গেলেই একজনের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠবেই। তিনি হলেন অমর নায়ক সালমান শাহ। নব্বই দশকের সবচেয়ে সুন্দর ও মেধাবী সেই চলচ্চিত্রশিল্পীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

১৯৯৬ সালের এই দিনে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান সালমান। দেখতে দেখতে তাকে হারানোর ২৪ বছর হয়ে গেল। তার মৃত্যুর দুই যুগ পরও চলচ্চিত্রের মানুষেরা আফসোস করে বলেন, ‘আজও কেউ পূরণ করতে পারেননি সালমান শাহের শূন্যস্থান।’ এই সময়ের নায়কদের কাছে তাদের প্রিয় নায়কের নাম জানতে চাওয়া হলে অকপটে তারাও বলেন প্রিয় সালমান শাহের নাম।

নাম নিয়েই যখন কথা, জেনে নেয়া যাক তার পারিবারিক নাম ও পরিচয়। তার বাবা-মায়ের দেয়া নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। চলচ্চিত্রে এসে নাম নেন ‘সালমান শাহ’। ১৯৭০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবার নাম কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী। তিনি ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে। সালমান শাহ ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট ভালোবেসে বিয়ে করেন সামিরাকে।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিরবিদায় নেন তিনি। হারিয়েও যেন হারাননি তিনি। কোটি ভক্তের হৃদয়ে সোনালী অক্ষরে লেখা আছে তার নাম। আজও সালমান যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত সেখানে তার ভক্তরা নীরবে চোখের জল ফেলেন।

যেদিন সালমান শাহের মৃত্যু হয় সেই দিন তার মৃত্যুতে সারাদেশে শোক নেমে এসেছিল। শোক সইতে না পেরে অনেক ভক্ত আত্মাহুতির পথও বেছে নিয়েছিলেন, এমনটাও শোনা গেছে। এরপর অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্প। কিন্তু সালমানের বিকল্প হয়ে ওঠতে পারেননি কেউ।

তার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ছবি করা নায়িকা শাবনূর আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সালমান বেঁচে থাকলে আমরা দুজনে উত্তম-সুচিত্রার মতো হতে পারতাম। সালমানের বিকল্প আমি আর কাউকে পাইনি।’

মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র জীবনে সালমান শাহ ২৭টি ছবিতে নায়ক ছিলেন। অল্প দিনের ক্যারিয়ার। কিন্তু যা কাজ করেছেন মন দিয়ে করে গেছেন। তার অভিনয়, পোশাক, স্টাইল, সংলাপ প্রয়োগ; সবই যেন সময়ের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক ছিলো। এগিয়ে ছিলো। দর্শকরা আজও তার ছবিগুলোকে এড়িয়ে যেতে পারেন না। টেলিভিশনের পর্দায় তার অভিনীত ছবি প্রদর্শন হলে হুমড়ি খেয়ে পড়েন দর্শক।

আজ সালমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি ভক্তরা শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন নানা আয়োজনে। কেউ লিখছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কেউ আবার মিলাদ মাহফিলেরও আয়োজন করছেন। এভাবেই যুগ থেকে যুগে সবার কাছে চিরসবুজ অমর নায়ক হয়ে বেঁচে থাকবেন সালমান শাহ।

মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি ছবিতে অভিনয় করেছেন সালমান শাহ। সোহানুর রহমান সোহানের পরিচালনায় ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবি দিয়ে তার যাত্রা শুরুতে ক্যারিয়ারের প্রথম নায়িকা হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন প্রিয়দর্শিনী মৌসুমীকে। এরপর ১৯৯৬ সালে ৬ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সালমান অভিনয় করেছেন তার সমসাময়িক ১১ জন নায়িকাদের বিপরীতে।

প্রথম ছবিতে মৌসুমীর সঙ্গে সালমানের জুটি দারুণ জনপ্রিয় হয়। অনেক নির্মাতাই তাদের নিয়ে ছবি করতে আগ্রহী হতে থাকেন। তারা শুরু করেন ‘অন্তরে অন্তরে’ নামে নতুন একটি ছবির শুটিংও। কিন্ত ব্যক্তি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে এই জুটি আর তেমন করে কাজ করেননি অনেকটা সময়।

‌পরবর্তীতে মৌসুমীর সঙ্গে সালমান শাহ অভিনয় করেন ‘দেনমোহর’ চলচ্চিত্রে। এই সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। এ ছাড়াও সালমান-মৌসুমী জুটি অভিনয় করেন ‘স্নেহ’ নামের আরও একটি সিনেমায়।

তবে ঢাকাই চলচ্চিত্রে সবচেয়ে সফল রোমান্টিক জুটি হিসেবে মনে করা হয় সালমান শাহ-শাবনূরকে। প্রয়াত নির্মাতা জহিরুল হক ১৯৯৪ সালে নির্মাণ করেন ‘তুমি আমার’। এই সিনেমার মাধ্যমে প্রথম একসঙ্গে অভিনয় করেন সালমান শাহ ও শাবনূর। এটি সালমানের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র হলেও নায়িকা হিসেবে শাবনূর তখন বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তবে সালমানের সঙ্গে জুটি গড়ার পরেই শাবনূরের ক্যারিয়ারে সুবাতাস বইতে থাকে।

এরপর একে একে ‘সুজন সাথী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মহামিলন’, ‘বিচার হবে’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বুকের ভিতর আগুন’; এই ১৩টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন সালমান-শাবনূর জুটি। সবগুলো ছবিই ছিলো সুপারহিট।

নির্মাতারা দারুণ আগ্রহী হয়ে উঠেন এই জুটিকে নিয়ে। আরও বেশ কিছু ছবিতে চুক্তিবদ্ধ করা হয় তাদের। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘নয়নমনি’, ‘তুমি শুধু তুমি’, ‘মন মানে না’, ‘অধিকার চাই’, ‘মধু মিলন’, ‘কে অপরাধী’, ‘শেষ ঠিকানা’ ইত্যাদি। তবে সালমানের হঠাৎ মৃত্যু সব কাজ থমকে দেয়। পরবর্তীতে সফল জুটি ভেঙ্গে যাওয়া শাবনূর এই ছবিগুলো করেছেন রিয়াজ, ওমর সানী, অমিত হাসানদের সঙ্গে।

শাবনূরের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি ১৯৯৪ সালের শেষ দিকে জীবন রহমান পরিচালিত ‘প্রেম যুদ্ধ’ চলচ্চিত্রে লিমার সঙ্গে জুটি বাঁধেন সালমান শাহ। পরের বছর দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ‘কন্যাদান’ চলচ্চিত্রেও দেখা যায় এই জুটিকে। কিন্তু এই জুটি খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি।

১৯৯৫ সালে হাফিজউদ্দিন পরিচালিত ‘আঞ্জুমান’ চলচ্চিত্রে জুটি বাঁধেন সালমান শাহ ও শাবনাজ। এই সিনেমাটির পর ‘আশা ভালোবাসা’ ও ‘মায়ের অধিকার’ সিনেমাতেও সালমান-শাবনাজ জুটিকে দেখা যায়। নাঈমের সঙ্গে জুটির বাইরে শাবনাজের সঙ্গে সফল জুটি ছিলেন সালমান শাহ।

এছাড়াও সালমান শাহের সঙ্গে অভিনয় করেছেন শিল্পী, শাহনাজ, বৃষ্টি, কাঞ্চি, শ্যামা ও সাবরিনা। ১৯৯৬ সালে মালেক আফসারী পরিচালিত ‘এই ঘর এই সংসার’ চলচ্চিত্রে সালমানের নায়িকা হিসেবে দেখা যায় বৃষ্টিকে। একই বছরে মডেল ও অভিনেত্রী শিল্পী ‘প্রিয়জন’ চলচ্চিত্রে সালমানের সঙ্গে জুটি বাঁধেন। এ ছবিতে দেখা যায় রিয়াজকেও।

ছটকু আহমেদ পরিচালিত ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ সিনেমায় সালমান শাহের বিপরীতে ছিলেন শাহনাজ। এই ছবিটি সালমান শাহ মারা যাওয়ার পরপরই মুক্তি পায়। আর ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আশা ভালোবাসা’ ছবিতে শাবনাজের পাশাপাশি দেখা গিয়েছিলো সাবরিনাকে।

১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘শুধু তুমি’ ছবিতে সালমানের নায়িকা হিসেবে ছিলেন শ্যামা। ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ ছবিতে শাবনূরের সঙ্গে সালমানের আরেক নায়িকা ছিলেন সোনিয়া। সেই ছবিটি ১৯ কোটি টাকা ব্যবসা করে এখন পর্যন্ত সর্বাধিক আয় করা চলচ্চিত্রের তালিকায় দ্বিতীয় হয়ে আছে বলে দাবি করেন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট অনেকেই।

সালমান শাহ আরও বেশ কিছু ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। সেসব ছবির কয়েকটিতে নায়িকা হিসেবে কাজ করার কথা ছিলো তখনকার নতুন মুখ পপির। এ নায়িকার অভিষেক হওয়া ছবি ‘কুলি’-তেই সালমান নায়ক ছিলেন। তার অকাল মৃত্যুর পর সেখানে নায়ক হয়ে অভিনয় করেছেন ওমর সানী।

আপনার মতামত লিখুন :