করোনায় প্রেম ও ভালোবাসা

0
547

করোনাভাইরাস মহামারি মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। বিশেষ করে করোনা ঠেকাতে সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা এবং অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ থাকায় একপ্রকার বন্দি জীবন-যাপন করতে হয়েছে প্রায় সকল বয়সের মানুষকে।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকায় তরুণরা ঘরের ভেতরে তাদের সময় কাটাচ্ছেন। ইন্টারনেট, মোবাইল, কম্পিউটার বা ল্যাপটপ হয়ে উঠেছে তাদের সময় কাটানোর অন্যতম সঙ্গী। ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই সেই সঙ্গে পড়াশোনার চাপ না থাকায় অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মেরে, মুভি দেখে তাদের সময় কাটছে। কিন্তু এতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য পুরোপুরি বিকশিত হচ্ছে না। তবে করোনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও সামাজিক যে বিষয়টি লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে সেটি হচ্ছে, করোনাকালীন প্রেম অর্থাৎ বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির মানুষের প্রেম, ভালোবাসা ও শারীরিক সম্পর্কের ওপর করোনার প্রভাব এবং এই প্রভাব থেকে সৃষ্ট সামাজিক সংকট।

দাম্পত্য জীবনের ওপর করোনার প্রভাব

করোনাকালীন বিবাহিত দম্পতিরা অনেকেই তাদের কাছের মানুষটিকে লম্বা সময়ের জন্য কাছে পেয়েছেন। এতে তারা একসঙ্গে অনেকটা সময় থাকার সুযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি একেক দম্পতির কাছে একেক রকম। যারা নব্যবিবাহিত তাদের কাছে সময়টা দীর্ঘ হানিমুনের মতো মনে হয়েছে। আবার যারা বৈবাহিক জীবনের অনেকটা সময় একসঙ্গে পার করে এসেছেন, তাদের কাছে বিষয়টি সমঝোতার। কিছু দম্পতি পেশাগত প্রয়োজনে হয়তো দূরে থেকেছেন কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া ও আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন অ্যাপ (হোয়াটস অ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইমো, স্কাইপে) ব্যবহারের মাধ্যমে প্রিয়জনের সঙ্গে সবসময় কানেক্টেড থেকেছেন।

করোনার কারণে দম্পতিদের কাছে আসার সুযোগ তৈরি হওয়া বা একসঙ্গে দীর্ঘসময় কাটানোর পজিটিভ দিকগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কিছু নেগেটিভ দিকও লক্ষণীয়। যেমন- দীর্ঘসময় একসঙ্গে থাকার কারণে, কাজের প্রেশার কম থাকার কারণে এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মানুষের মধ্যে একঘেয়েমি চলে আসে এবং হতাশা তৈরি হয়। হতাশা একসময় রাগে রূপান্তরিত হয়। ফলে খুঁটিনাটি বিষয়ে ঝগড়াসহ বিভিন্ন পারিবারিক কলহ তৈরি হতে দেখা যায়। দিনের পর দিন ঘরে থেকে অনেকেই মানসিক অস্থিরতা ভেতরে চেপে রাখতে পারেন না। ছোট ছোট বিষয়ে হয়তো রিঅ্যাক্ট করেন, রেগে যান। এই রাগ বেশিরভাগ সময় ঝরে পড়ে সঙ্গীর ওপর। ফলাফল দাম্পত্য কলহ, অশান্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঙ্গী সবসময় কাছে থাকলে আকর্ষণ অনেক সময় কমে যায়। বিচ্ছেদের ফলে সেই আকর্ষণ বেড়ে যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক মেখলা সরকার তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি দেখতে পাচ্ছি যে, করোনার কারণে সৃষ্ট গৃহবন্দি পরিস্থিতিতে পারিবারিক সহিংসতা অনেকাংশে বেড়ে যাচ্ছে।

তরুণ-তরুণীদের প্রেম

করোনার এ ঘরবন্দি সময়টাতে তরুণ-তরুণীরা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না ঠিকই কিন্তু তাদের প্রেম চলছে অনলাইনে। ঘর থেকে বের হতে না পারলেও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে তারা যোগাযোগ বজায় রাখছেন। যারা আগে পার্কে, রেস্টুরেন্টে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোণায় বসে নিজেদের প্রেমটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন তারা এখন অনলাইনে হোয়াটস অ্যাপ, মেসেঞ্জার, স্কাইপেতে প্রেমটা সারছেন। অডিও ও ভিডিও, দুই মাধ্যমেই যোগাযোগ বজায় রাখছেন তারা। তবে সম্পর্কের মাঝে স্পর্শের যে অনুভূতি সেটা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে তাদেরকে। যার কারণে তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকা দূরত্ব ঘোচাতে অনলাইনেই শেয়ার করছেন নিজেদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি কিংবা ভিডিও। করোনার কারণে অনেকের ভালোবাসার সম্পর্কে ফাটলও তৈরি হয়। দীর্ঘদিন সরাসরি যোগাযোগ বঞ্চিত থাকায় অনেক তরুণ-তরুণী ভিন্ন সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে তাদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে এবং পরবর্তীতে তারা প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।

প্রেমহীন শারীরিক সম্পর্ক

সকল শারীরিক সম্পর্কই প্রেম থেকে সৃষ্টি, তা নয়। ভালোবাসা বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক আমাদের সমাজে বিদ্যমান রয়েছে। মানুষ তার জৈবিক চাহিদা মেটাতে সব সময় প্রেমনির্ভর নয়, কারণ প্রেম ছাড়াও অর্থের বিনিময়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব। অর্থের বিনিময়ে জৈবিক চাহিদা মেটাচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শুধু যৌনপল্লী নয় বরং বিভিন্ন উচ্চমানের হোটেল বা অনেক উচ্চপদস্থ মানুষ তাদের ব্যক্তিগত সময় কাটানোর জন্য গড়ে তুলেছেন আলাদা আবাসস্থল, যেখানে অবাধে অর্থের বিনিময়ে চলছে অবাধ শারীরিক সম্পর্ক।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক

করোনার মধ্যে বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কের হার অনেক বেড়েছে। এ নিয়ে যদি কোনো গবেষণা হতো তাহলে বোঝা যেত এই হারটি আসলে কত। শুধুমাত্র স্ত্রীর সঙ্গে সর্ম্পকেই সন্তুষ্ট, এমন মানুষের সংখ্যা এখন উদ্বেগজনকভাবেই কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অবৈধ এ শারীরিক সর্ম্পকের কোনো বয়সভেদও দেখা যাচ্ছে না। টিনএজ থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা, সবাই নানা রকম শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহী। একজন পুরুষ ও নারীর মধ্যে আবেগ, ভালোবাসা, প্রেম কাজ করবে— এটাই স্বাভাবিক। এই প্রেমের অনিবার্যতায় তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হতেই পারে। কিন্তু এখন যে শারীরিক সম্পর্কগুলো হচ্ছে তার কতটুকু প্রেম? নাকি এটা শুধু টাইম পাস। অনেকেই স্বীকার করেছেন যে, একাকিত্বের জীবনে টাইম পাসের জন্য তাদের শারীরিক সম্পর্ক জরুরি। এই শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে তারা সজীব হন, সতেজ হন। তাদের তারুণ্য ধরে রাখতে পারেন। অবসাদ থেকে তারা মুক্ত হন। আবার অনেকেই বলছেন যে, শারীরিক সম্পর্কের প্রধান কারণ হলো প্রেম। প্রেম থেকেই প্রিয় মানুষকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই ঘনিষ্ঠতা, ঘনিষ্ঠতা থেকেই তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের জন্ম। তারা মনে করেন যে, বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। পুরুষ ও নারী যদি একমত হন, তাহলে সেই শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকার কথা নয়। কিন্তু এরাই কয়েকদিন পর ধর্ষিত হওয়ার অভিযোগ তোলেন। অনেকে বহুগামিতার পথেও আকৃষ্ট হচ্ছেন। এক নারী বা এক পুরুষ নয়, বহু নারী বা বহু পুরুষের সঙ্গে বিচিত্র বহুগামী সম্পর্কে আকৃষ্ট হচ্ছেন অনেকে। এটা যে, শুধু পুরুষের বেলায় প্রযোজ্য, তা না। পুরুষ ও নারী দুজনের মধ্যেই বহুগামিতা দেখা যাচ্ছে। একজন পুরুষের অনেকগুলো মেয়ে বান্ধবী। দিন-তারিখ নির্ধারণ করে তারা শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করেন। আবার অনেক মেয়েরও একাধিক বয়ফ্রেন্ড এবং একাধিক সম্পর্ক রয়েছে। করোনার ঘরবন্দি অবস্থার অবসাদ থেকে নিজেদের চাঙ্গা করতেই এসব বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে মানুষ।

সাইবার অপরাধ

করোনার সময় সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোবাইল ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় যে কেউই এখন ইন্টারনেট জগতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। ফলে এমনিতেই ধর্ষণের শিকার হয়ে বিপর্যস্ত ভিকটিম ও তার পরিবার নতুন করে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছেন। করোনার মধ্যে মানুষ ইন্টারনেটে বেশির ভাগ সময় কাটানোয় নানা রকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবির অপব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংসহ নানা রকম হয়রানির পরিমাণ বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিকটিম নিজেও জানছেন না তার তথ্য ও ছবি ব্যবহার করে অপরাধীরা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিকার চাওয়া তো দূরের কথা, অনেক সময় সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে তা প্রকাশ করাও মুশকিল হয়ে পড়ে। এ ধরনের ঘটনা রোধে সরকারের সাইবার ক্রাইম ইউনিট কাজ করলেও অপরাধ দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং দায়ীদের কঠোর সাজার সম্মুখীন করতে হবে। পাশাপাশি ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

*মডেল: এম এ মান্নান ভূঁইয়া ও আয়শা আক্তার *ছবি তুলেছেন ফটোগ্রাফার ওমর

আপনার মতামত লিখুন :