ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমাবে ডিএনডি এলাকা

0
119

প্রায় ১৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকার প্রজেক্টের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। কাজ শেষ হলে ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমাবে এই ডিএনডি এলাকা, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পুরণ হবে ডিএনডি এলাকায় বসবাসরত প্রায় ২০ লাখ মানুষের। একই সাথে দীর্ঘ প্রায় ২৫ দুই যুগের জলাবদ্ধতার অবসান ঘটবে। দুর হবে মানুষের সীমাহীন ভোগান্তির এমনটাই ধারণা করছেন নগর পরিকল্পনাবীদরা।
এ বিষয়ে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমান বলেছেন, হাতিরঝিলের চেয়েও সুন্দর হবে ডিএনডি এলাকা। ডিএনডির কাজ শেষ হলে এটি হবে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মাঝে একটি নতুন উপশহর। তখন এই উপশহরকে ঘিরেই জমে উঠবে রাজধানী ও নারায়ণগঞ্জবাসীর সকল কার্যক্রম। তিনি বলেন, প্রায় ১৭০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলমান এ প্রজেক্টে।
জানা যায়, এক সময় এই ডিএনডি ছিলো দেশের বসবাসযোগ্য উচু স্থানগুলোর অন্যতম। আর সে কারণেই ৮৮’র বন্যায় দেশের প্রধান প্রধান শহর বন্যার পানিতে ডুবে গেলেও ডিএনডি এলাকার পুরো অংশই ছিলো শুকনো। কিন্তু পরবর্তীতে একে একে এখানে বিভিন্ন মিল-কারখানা, ইন্ডাস্ট্রি, বসতবাড়ি সহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠে। এই সকল স্থাপনার সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় এখানকার অসংখ্য খাল দখলের মহোৎসব। যার ফলে এক সময় সকল খাল ভরাট হয়ে পানি জমতে থাকে এই ডিএনডি এলাকায়। ধীরে ধীরে পানিবন্দী হতে থাকে এখানকার বাসিন্দারা। অবশেষে দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে জলাবদ্ধতায় আবদ্ধ এখানকার জনজীবন। থমকে যায় প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মজীবন। চাকরীজীবীরা পানি বন্দী হয়ে চাকরীতে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, ব্যবসায়ীরা জলাবদ্ধ এই এলাকা থেকে একবার বাইরে আসতে পারলে পুনরায় আর যেতে চাননা তাদের ব্যবসাকেন্দ্রে বা আবাসস্থলে, শিক্ষার্থীরা তাদের বই নিয়ে স্কুলে যেতে পারতো না, বসে থাকতো ময়লা-দূর্ঘন্ধযুক্ত এই পানির মধ্যে।
এ সকল সমস্যাকে মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রী প্রথম ধাপে ৫৮৮ কোটি টাকার বিশাল এক প্রজেক্টের অনুমোদন দেন। শুধু অনুমোদনই নয়, বলেও দিয়েছিলেন প্রয়োজনে আরো অর্থের বরাদ্দ দেয়া হবে। ৫৮৮ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয় ধরা হলেও প্রকল্পের স্থায়ী সুবিধা, ঝলমলে নতুন একটি উপশহর সৃষ্টিতে এবং সৌন্দর্যবর্ধন করার লক্ষে প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয় ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারনা করেছিলো প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তারই ধারাবাহিকতায় সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এ প্রকল্পে।
স্থানীয়দের সুত্রে জানা যায়, যুগের পর যুগ ধরে এখানকার বাসিন্দারা জলাবদ্ধতায় ডুবে থেকে দুর্ভোগ পোহাতো। বছরের সবসময়ই এখানে জমে থাকতো ময়লা দুর্ঘন্ধযুক্ত পানি। এই জলাবদ্ধতা নিরসন করে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে এই ডিএনডি প্রকল্পের কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২০ ইসিবি, ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনষ্ট্রাকশন ব্রিগেড। সেনাবাহিনী এই ৫৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকার পানি নিস্কাশন ব্যবস্থায় একটি স্থায়ী সমাধান করছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক কাজটি করা হচ্ছে বলে ডিএনডি বাসীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছে। জোরেশোরে চলছে প্রকল্পের সংস্কার কাজ। কাজ শুরুর পর থেকে ইতিমধ্যেই প্রকল্পের অগ্রগতি অনেকাংশে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। আর এটিকে ইতিবাচক হিসাবে দেখার পাশাপাশি এবং আশান্নিত হচ্ছেন ডিএনডিবাসী। ইতিবাচক হিসাবে দেখলেও গত বর্ষা মৌসুমেও কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিলো এখানকার বাসিন্দাদের। কিন্তু পরবর্তীতে সাংসদ শামীম ওসমানের হস্তক্ষেপো সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পানি নিস্কাশেনের দুটি পথ খুলে দেয়ায় পানি সরে যায় এবং ডিএনডির লোকজন এর সুফল ভোগ করেছিলে। এছাড়াও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অবশ্য ডিএনডিবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, আগামীতে আর কখনোই আগের মতো পানি জমে থাকবে না এবং জলাবদ্ধতারও সৃষ্টি হবে না। আর এই খবরে ডিএনডিবাসী স্বত্বি প্রকাশ করেছে।
তবে দীর্ঘদিনের অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে ডিএনডির খালগুলোকে মুক্ত করতে কিছুটা সময় লাগছে বলে জানান প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, প্রথমত, ডিএনডির ৯৪ কিলোমিটার খালের অবৈধবাসীদের উচ্ছেদ এবং ডিএনডিতে বড় ২টি ও ছোট ৩টিসহ ৫টি পাম্প হাউস নির্মাণকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অনেক অবৈধ দখলদার স্বেচ্ছায় তাদের দখল ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু কিছু কিছু দখলদার দখল ছাড়তে বিলম্ব করায় তাদের কাগজগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কিছুটা সময় বেশি লাগছে। এ ছাড়াও সিদ্ধিরগঞ্জে ডিএনডির প্রধান খাল থেকে সরাসরি যাতে শীতলক্ষ্যা নদীতে পানি প্রবাহিত হয়, সে জন্য আদমজীনগর সোনামিয়া মার্কেট সংলগ্ন ব্রিজ থেকে সুমিলপাড়া ক্রাউন সিমেন্ট প্রজেক্ট পর্যন্ত খালটি অবমুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আরও জানা যায়, এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে জনসংখ্যার চাপ কমতে পারে রাজধানীর উপর থেকে। কেননা কাজ শেষ হলে এটি হবে একটি নতুন উপশহর। যে উপশহরটি হবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন এবং পরিপাটি। আর রাজধানীর অদুরে এমন একটি উপশহর সৃষ্টি হলে ঢাকা’র উপর থেকে জনসংখ্যার চাপ যে কিছুটা হলেও কমবে তা বলাই বাহুল্য। ডিএনডির একটি অংশ শ্যামপুর থেকে শুরু হয়ে সমগ্র ফতুল্লা ইউনিয়ন, এনায়েতনগরের ৯নং ওয়ার্ড। আরেকদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সমগ্র সিদ্ধিরগঞ্জ অংশ। অপর একটি অংশ হলো ডেমরা কেন্দ্রীক। আর এই সবগুলো এলাকাই রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে নিকটবর্তী। সে কারণেই কিছুটা নয় অনেকাংশেই রাজধানীর উপর জনসংখ্যার চাপ কমবে বলে আশাবাদী নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে যদি এই উপশহরটিকে নতুন আঙ্গিকে সাজানো যায় তবেই রাজধানীর উপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমতে পারে।
পাউবো সূত্রে জানা যায়, সরকারের নেয়া ১৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ডিএনডি প্রকল্পে’ রয়েছে শিমরাইল ও আদমজী এলাকায় ২টি পাম্প স্টেশন নির্মাণ করা। এ ছাড়া ফতুল্লা, পাগলা ও শ্যামপুরে ৩টি পাম্পিং প্লান্ট নির্মাণ করা। ডিএনডি এলাকার বিভিন্ন স্থানে ৭৯টি কালভার্ট, ২টি ক্রস ড্রেন, ১২টি আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ ও ৫২টি বিদ্যমান ব্রিজ ও কালভার্ট মেরামত করা হবে। শিমরাইল, আদমজীনগর, পাগলা, শ্যামপুর ও ফতুল্লা পাম্প স্টেশন বা প্লান্টের কমান্ড এরিয়ায় ৯৩.৯৮ কিলোমিটার নিস্কাশন খাল পুনঃখনন করা, ৩২ হাজার ৫০০ ঘনমিটার অতিরিক্ত সংযোগ খাল পুনঃখনন ও ৯৩.৯৮ কিলোমিটার পুনঃখননকৃত খালের তীর উন্নয়ন করা হবে। ১৩.৫০ কিলোমিটার হেরিংবোন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। আর সম্পূর্ণ কাজ শেষ হবে ২০২০ সাল নাগাদ।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে ডিএনডির সংস্কারের মাধ্যমে ডিএনডির জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকার প্রকল্প নীতিগত অনুমোদন দেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যদি আরও অর্থের প্রয়োজন হয় সেটারও ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এই প্রকল্প অনুমোদনের পর গত বছরের ৮ ডিসেম্বর প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।

আপনার মতামত লিখুন :