নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য যুব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করুন রোদেলা হানিফ সুমি

0
42

‘যে জাতি যতো বেশি শিক্ষিত, সে জাতি ততো উন্নত’-একথা সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশের শিক্ষার হার অব্যাহতভাবে বাড়ছে। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার শতকরা ৭২.৮ ভাগ। ভারতে এই হার ৬৯.৯, পাকিস্তানে ৫৭। এটা স্পষ্ট যে, ভারতীয় উপ-মহাদেশে সাক্ষরতায় বাংলাদেশ এগিয়ে। এই এগিয়ে থাকা যেমন আমাদের জন্য একটা সুখকর বার্তা বহন করে, বিপরীতে বাংলাদেশের শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা অংশ বেকার বা কর্মহীনতার হার আমাদের সামনে হতাশার চিত্র উপস্থাপন করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে একটা বিরাট অংশ কর্মহীন বা বেকার। এরমধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকারের হার সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়, স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার প্রায় ৩৭ শতাংশ এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হলো ৩৪ শতাংশ। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করা তরুণ-তরুণীর মধ্যে বেকারত্বের হার যথাক্রমে ২৭ ও ২৮ ভাগ। এসএসসি, এইচএসসি, ¯œাতক এবং ¯œাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ৬ লাখের বেশি ব্যক্তিদের উপর জরিপ করে এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়। লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশে উচ্চ ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যাই বেশি। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি যেখানে সমাজ ও দেশকে নিজের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে এগিয়ে নেবার কথা, সেখানে তার বেকারত্ব হতাশাজনকই নয়, উদ্বেগেরও বটে। উচ্চশিক্ষার জন্য এটা অংশনি সংকেত।

চাকরি নামের সোনার হরিণ অনেকের কাছে থাকে অধরা। ফলে শিক্ষার হারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেকারত্বের সংখ্যাও বাড়ছে। এ অবস্থা দূরীকরণে প্রতিবছর ২ থেকে ৩ শতাংশ হারে কর্মপদ সৃজন করা প্রয়োজন। সেই সাথে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ কার্যক্রমে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একটি যুব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হলে এবং সেই ব্যাংকে এ বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্ব দেয়া হলে বেকারত্ব দূরীকরণ এবং নব উদ্যোক্তা গড়ে উঠার পথ সহজ হতে পারে।

এ কথা অজানা নয় যে, চাকরি নামের সোনার হরিণকে ধরার জন্য স্বল্প শিক্ষিত, মধ্যম শিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের কতো দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। এরপরও সবার চাকরি জুটে না। প্রতি বছর যে সংখ্যক ব্যক্তি শিক্ষা পর্ব শেষ করে, চাকরির বাজারে বা কর্ম প্রতিষ্ঠানে সেই পরিমাণ কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা নেই। এ কারণে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলছে। যে দেশের অধিকাংশ মানুষ উর্পাজনশীল, নিজের খরচ নিজে চালাতে পারে, সে দেশে জনসংখ্যা জনশক্তিতে পরিণত হয়। আবার যে দেশের একটা বিরাট সংখ্যক মানুষ কর্মক্ষম, তবে কাজ পায় না তথা বেকার, সেসব দেশে জনসংখ্যা বোঝা হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা জনশক্তির বিপরীতে বোঝা হওয়ার পথে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লাখ, যার মধ্যে কাজ করেন ৬ কোটি ৮ লাখ নারী-পুরুষ। এ হিসাব মতে দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। মোট বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই বেকারত্বের চিত্রটি দেখে তৃপ্তির ঢেকুর গিলার কিছু নেই। বেকারত্বের এই হার কমে এসেছে অন্য কারণে। আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও’র সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘যারা সপ্তাহে একঘন্টাও মজুরির বিনিময়ে কোনো কাজ পান না, কেবল তাদেরকেই বেকার বলা হয়। এমন কি কোনো ব্যক্তি যদি সপ্তাহে অন্তত একদিনও এক ঘন্টা কাজ করে এবং তার বিনিময়ে সে যে অঙ্কের মজুরি পান না কেনো,ওই মজুরি যত সামান্যই হোক না কেনো তাতে তার জীবনধারণ হোক বা না হোক,ঐ ব্যক্তি আর বেকার থাকবেন না।’

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আইএলও’র সংজ্ঞায়নের কারণে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা কম, যাতে বেকারত্বের প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেনি। আইএলও’র– এই সংজ্ঞার বাইরেও বেকার জনগোষ্ঠী নিরূপণের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো আরেকটি মানদ- নির্ধারণ করেছে। তারা বলেছে, সপ্তাহে ৪০ ঘন্টা যারা কাজের সুযোগ পান না, তারা হলো ‘ছদ্মবেকার’। তারা সম্ভাবনাময় কিনতু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো হচ্ছেনা। দেশের এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ, যারা পছন্দ অনুযায়ী কাজ না পেয়ে টিউশনি, বিক্রয়কর্মী, কলসেন্টারকর্মী, রাইডশেয়ারিং প্রভৃতি খণ্ডকালীন কাজ করছেন।

অন্যদিকে শ্রমজীবী অধিকার নিয়ে কাজ করা বেশ কিছু সংস্থার মতে, দেশে কর্মহীন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ন্যূনতম ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৫ কোটির মধ্যে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৭ সালের জরিপের তথ্যানুযায়ী- দেশে অশিক্ষিত বেকার যেখানে ৩ লাখ, সেখানে শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৩ লাখ ৭৭ হাজার। যাদের মধ্যে প্রাথমিক পাশ বেকারের সংখ্যা ৪ লাখ ২৮ হাজার, মাধ্যমিক পাশ বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৯৭ হাজার, উচ্চমাধ্যমিক পাস বেকারের সংখ্যা ৬ লাখ ৩৮ হাজার এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বেকারের সংখ্যা ৪ লাখ ৫ হাজার। অর্থ্যাৎ উচ্চশিক্ষিতদের মাঝেই বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি। যা দেশের মোট বেকারত্বের হারের এক তৃতীয়াংশ।

উচ্চশিক্ষার সনদ এখন আর কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। আইএলও’র কর্মসংস্থান নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তরুণ-তরুণীরা যতো বেশি পড়ালেখা করছে, তাদের ততো বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে। পাকিস্তানে এ হার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাড়িয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের বড় অংশ আবার নিস্ক্রিয়। তারা কোনো ধরণের শিক্ষায় যুক্ত নন, প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন না, আবার কাজও খুঁজছেন না। দেশে এমন তরুণের হার ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। মেয়েদের মধ্যে এই হার বেশি, ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি। চলমান করোনাভাইরাসের কারণে দেশে কর্মসংস্থানের ব্যাপক ঘাটতি তৈরি করছে। ফলে বেকারত্বের হার বাড়ছে। গত ৮ মার্চ যখন প্রথম করোনাভাইরাস রোগী শনাক্তের ঘোষণা দেয়া হয়, তখন দেশে কর্মসংস্থান ছিল ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষের। কিনতু এরপর থেকে ক্রমাগত মানুষ কাজ হারাতে শুরু করে। অনুমিত ধারণা যে, করোনা মহামারীর কারণে কর্মহীনতার তালিকায় নতুন করে যুক্ত হবে আরও দেড় কোটি মানুষ।

উপর্যুক্ত জরিপ ও তথ্য পর্যালোচনা করে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এই বেকারত্বের পেছনে দায়ী কে বা কোন কোন অনুষঙ্গ দায়ী? অল্প কথায় হয়তো এর জবাব দেয়া কঠিন। ছোটবেলা থেকে দীর্ঘসময় পর্যন্ত মানুষকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হয়। উজ্জ্বল ক্যারিয়ার গঠনই শিক্ষার মূল লক্ষ্য। কিনতু প্রশ্নটা থেকেই যায় যে, দীর্ঘব্যাপ্তির এই শিক্ষারব্যবস্থা বেকারত্ব দূরীকরণে কী ভূমিকা রাখছে? অনেকেই কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের পিছিয়ে পড়ার পেছনে মূলত শিক্ষার গুণগত মানকে দায়ী করেন। তারা মনে করেন বাংলাদেশের শিক্ষার মান নি¤œমুখী।

এছাড়াও উচ্চশিক্ষার মানহীনতা, পাশাপাশি প্রশিক্ষণের অভাব, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত শিক্ষা দিতে না পারা ও শিক্ষায় কম বিনিয়োগ ইত্যাদি এর কারণ বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তথা জিডিপি যে হারে বাড়ছে, সে অনুযায়ী দেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। শ্রমবাজারের তুলনায় চাকরির বাজার ছোট হওয়ায় সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীরাও চাকরি পাচ্ছে না। বেকারত্ব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো-সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব, অবকাঠামোগত সমস্যা, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, গ্যাস – বিদ্যুতের সংকট আর উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতা। যার ফলে নতুন নতুন ও প্রয়োজন অনুসারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। কৃষিকাজের অনগ্রসরতাও বেকারত্ব সমস্যাকে আরও প্রকট করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশেষে অনেক তরুণের মাঝে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এটি বাংলাদেশের জন্য খুব ইতিবাচক দিক। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে লেখাপড়া শেষে চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্ততা হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি ‘বস’ হতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান উদ্যোক্ততা হতে আগ্রহী কিংবা নবীন উদ্যোক্ততাদের জন্য উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণাদায়ক, সন্দেহ নেই। কিন্তু উদ্যোক্ততা হতে হলে অর্থের বিকল্প নেই। এই অর্থপ্রাপ্তি বা অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করা বড় জরুরি। বাংলাদেশে উদ্যোক্ততা হওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ পাওয়া অনেক কঠিন। উদ্যোক্ততার পুরো বিনিয়োগ শুধু নয়, অর্ধেক কিংবা তারও কম অংশ পরিমান অর্থ পাওয়াও কঠিন। ব্যাংক বা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অর্থ ছাড়ের বিষয়ে ব্যাপক শর্তারোপ এবং কড়াকড়ির ফলে অনেক উদ্যোক্ততার স্বপ্ন শুরুতেই ভেস্তে যায়। আমরা লক্ষ করি, এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক যে অর্থ নিয়ে মেরে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে বরং তাকেই অর্থ দিয়ে থাকে। এ ধরনের ক্ষেত্রে শর্ত থাকে শিথিল। অন্যদিকে, তরুণ এবং নবাগত উদ্যোক্ততাদের কঠিন শর্তের বেড়াজালে ফেলা হয়। ফলে যারপরনাই হতাশ হয়ে নতুন উদ্যোক্ততা নিরাশ হয়ে চাকরির পেছনে ছুটে।

এই চাকরি নামের সোনার হরিণ অনেকের কাছে থাকে অধরা। ফলে শিক্ষার হারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেকারত্বের সংখ্যাও বাড়ছে। এ অবস্থা দূরীকরণে প্রতিবছর ২ থেকে ৩ শতাংশ হারে কর্মপদ সৃজন করা প্রয়োজন। সেই সাথে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ কার্যক্রমে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একটি যুব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হলে এবং সেই ব্যাংকে এ বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্ব দেয়া হলে বেকারত্ব দূরীকরণ এবং নব উদ্যোক্তা গড়ে উঠার পথ সহজ হতে পারে।

লেখক : শিক্ষার্থী।

সূত্র: জাগো নিউজ
আপনার মতামত লিখুন :