বিজয়ের দিনও বন্দি ছিল বঙ্গবন্ধুর পরিবার

0
62

বাঙালি জাতির বিজয়ের দিন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশের মুক্তাঞ্চলে আনন্দের বন্যা বইলেও রাজধানীর ধানমন্ডিতে হানাদারদের হাতে বন্দি বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয়েছিল। সেই সময় ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর পত্নী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তার কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, পুত্র শেখ রাসেল ও শেখ হাসিনার শিশু সন্তান জয়সহ অনেকে বন্দি ছিলেন।

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। অপরদিকে তার পরিবারকে বন্দি করে রাখা হয় ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের ২৬ নম্বর বাড়িতে। ওই বাড়ির ছাদে পাকিস্তানি বাহিনী দুদিকে দুটো বাঙ্কার করে মেশিনগান বসিয়েছিল। এছাড়া আরেকটি বাঙ্কার গ্যারেজের ছাদে করা ছিল।

স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষ্যে, পাক-হানাদার বাহিনীর আত্মসমপর্ণের দিন রাস্তায় রাস্তায় মানুষের ঢল, বিজয়োল্লাস। আমরা বাড়িতে বন্দি কয়টি প্রাণী মৃত্যুর প্রতীক্ষায় যেন প্রহর গুনছি। আমরা নরকে বসে দেখছি হায়েনার শেষ কামড়।

সেই ১৬ ডিসেম্বরেও তাদের দেখতে যারা ওই রাস্তা দিয়ে যেতেন তাদেরই হত্যার চেষ্টা করত পাকিস্তানি সেনারা। এর মধ্যে কয়েকজন প্রাণও দেন। আর এসব নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চলেছে ২৬ নম্বর বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে। পরে ১৭ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেলে উদ্ধার করে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে উঠে এসেছে সেসময়কার রুদ্ধশ্বাস এসব ঘটনার বর্ণনা।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘গতকাল থেকে বারবার ঘোষণা শুনছি আজ রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে। চারদিকে ভোর থেকে হৈ চৈ, জয় বাংলার জয়ধ্বনি। আমরা ধানমন্ডি ১৮ নম্বর রোডের এই বাড়িতে গত আট মাস ধরে বন্দি। সবসময় ঘরের ভেতর থাকতে হয়। বাইরের ধ্বনি ভেসে এলেই রাসেল পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে চিৎকার করে ওঠে “জয় বাংলা” বলে।’

‘জানি আমাদের এই কণ্ঠধ্বনি এই বন্দিশালার দেয়াল ভেদ করে রাজপথের আনন্দের উল্লাসের স্রোতে মিশবে না; তবু কি মনের এই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ চেপে রাখা যায়? সে যেন আজ পাগলপারা নদী! মনের সব আকাঙ্ক্ষা-ইচ্ছে সেদিন বিজয় মিছিলে ছোটাতে গিয়ে বারবার সেই বন্দিশালার চার দেয়ালের আঘাতে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। চোখের কোণ অশ্রুভরা, রাসেলের চাপা আনন্দ। এই বিজয় দিবস কত আকাঙ্ক্ষিত আমাদের জন্য। রাস্তার শেষ মাথায় সাত মসজিদ রোডে। সেখান থেকেই বোধহয় মিছিলের মানুষের ধ্বনি ভেসে আসছে। আমরা এই বন্দিশালা থেকে কখন মুক্ত হবো– কখন ওই বিজয় মিছিলে যাব সবার সাথে? আমরা কি পারব মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে? স্বাধীনতা আমার, আমার স্বাধীনতা। স্বাধীনতার স্বাদ কি আমরা পাব না?’

বাঙালির বিজয়ের আগে হানাদারদের নির্মমতার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘…দীর্ঘ নয়টি মাস দেশটা শত্রুর কবলে ছিল, শুধু আর্তচিৎকার, গুলির শব্দ, আর মৃত্যুর শোক মানুষের জীবনকে অর্ধমৃত ও আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছিল। সে যেন এক দুর্বিষহ অবস্থা। নিশুতি রাতের কুকুরের করুণ কান্না, জলপাই রং মিলিটারি জিপ বা ট্রাকের আওয়াজ। হঠাৎ করে গুলির শব্দ বা গ্রেনেড ফোটার আওয়াজ, বস্তির ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে, তার হালকা আভা ও ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে যাওয়া; অসহায় নারী পুরুষের আর্তচিৎকার– এই তো ছিল ঢাকা শহরের প্রতিদিনের দৃশ্য।’

‘সমগ্র দেশটাই ছিল এক বন্দিশালা। এরই মাঝে জীবনের ধ্বনি যেন পাওয়া যেত, যখন শোনা যেত কোনো মুক্তিযোদ্ধার গুলি বা বোমার শব্দ, মিলিটারি মারার খবর। তাদের যেকোনো আক্রমণ বা গ্রেনেড ফোটার বিকট শব্দ হলে শত্রুপক্ষ সন্ত্রস্ত হতো মনে হতো আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকব, আমাদের অস্তিত্ব এখনো আছে। অমৃতের বরপুত্র এই মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের যেন নতুন করে জীবনদান করে যেত!’

বিজয়ের চূড়ান্ত লগ্নেও বঙ্গবন্ধু পরিবারের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘গত কয়েক দিন থেকে সীমাহীন দুর্দশায় কাটছে আমাদের। মৃত্যুর মুখোমুখি যেন। যখন-তখন মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে ওরা হাজির হতে পারে। সারাদিন, সারারাত এক অদ্ভুত অনুভূতির মধ্য দিয়ে কাটাতে হচ্ছে। আব্বা কি বেঁচে আছেন? কোথায় কী অবস্থায় আছেন কিছুই জানি না। কামাল, জামাল, নাসের কাকা, মনি ভাইসহ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, আওয়ামী লীগের, ছাত্রলীগের সবাই তো মুক্তিযুদ্ধে। কে আছে, কে নেই, কোনো খবর জানা নেই। যদিও এই বন্দিদশার মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কিছু যোগাযাগ ছিল, কয়েকদিন থেকে তাও একেবারেই বিচ্ছিন্ন। চারদিকে এত প্রতিধ্বনি-রেডিওতেও শুনেছি দেশের প্রায় সব এলাকা স্বাধীন, মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে।’

jagonews24‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইয়ের প্রচ্ছদ এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার কন্যা শেখ হাসিনা

‘ভারতীয় বাহিনীর সৈন্যদের সাথে তারা এখন ঢাকার পথে মার্চ করে চলেছে। আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী, ছাত্রলীগের সাথীরা কে কোথায় কী অবস্থায় রয়েছে জানি না।’

বিজয়ের দিনও বন্দি থাকার দুঃসহ অনুভূতি বর্ণনায় শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘…আজ এসেছে বিজয়ের দিন। কিন্তু হায়! আমরা তো রুদ্ধদ্বার, মুক্তপ্রাণ!’

‘আমরা যে বাড়িটাতে বন্দি ছিলাম তার ছাদের উপর দুদিকে দুটো বাঙ্কার করে মেশিনগান বসান হয়েছে। এছাড়া আর একটা বাঙ্কার গ্যারেজের ছাদে করা হয়েছে। বাগানের মাটি কেটে ট্রেঞ্চ খোদা হয়েছে। দিনরাত গুলির আওয়াজ। যখন বিমান আক্রমণ হয় তখন সব সৈন্য ট্রেঞ্চে ঢুকে যায় এবং বাঙ্কারে গিয়ে দাঁড়ায়। কেবল আমরা যারা বন্দি আমাদের মৃত্যু প্রতীক্ষায় প্রহর গুনতে হয়। চার মাসের জয়কে নিয়ে হয়েছে অসুবিধা। বিছানায় শোয়ানো যায় না, গুলির আওয়াজে কেঁপে ওঠে। রাসেল পকেটে তুলো রাখে। ওর কানে তুলো গুঁজে দেয়, যাতে গুলির আওয়াজে কানের পর্দা ফেটে না যায়। রাসেলকে নিয়ে হয়েছে আরও মুশকিল। বিমান আক্রমণ শুরু হলেই সে ছুটে বারান্দায় চলে যেতে চায় অথবা সোজা মাঠে যেতে চায় বিমান দেখতে। অনেক কষ্টে ওকে ধরে রাখতে হয়। কিছুতেই বোঝানো যায় না। মা, রেহানা, আমি যে যখন পারি ওকে আটকে রাখতে চেষ্টা করি। ঘরের ভেতরে মাদুর পেতে মাটিতে সকলকে নিয়ে বসে জানালা দিয়ে বিমান যুদ্ধ দেখি। আর প্রতীক্ষায় থাকি কখন শত্রুমুক্ত হবে দেশ। এভাবেই কয়েকটি দিন আমরা কাটিয়েছি।’

হানাদারদের আত্মসমর্পণের আগে ঢাকার রাস্তায় জনতার উল্লাসের কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু কন্যা লিখেছেন, ‘আজ পাক-হানাদার বাহিনী আত্মসমপর্ণ করবে। সকাল ১১টা পর্যন্ত সংবাদ পেলাম ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী ঢুকে গেছে। রাস্তায় রাস্তায় মানুষের ঢল, বিজয়োল্লাস। আমরা বাড়িতে বন্দি কয়টি প্রাণী মৃত্যুর প্রতীক্ষায় যেন প্রহর গুনছি।’

‘ঢাকা শহর মুক্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই গাড়ি নিয়ে বাসার সামনে দিয়ে যাতায়াত শুরু করল, অনেকেই আমাদের খোঁজ-খবর নিতে বা বাড়িতে ঢুকতে চেষ্টা করল। কিন্তু প্রহরীরা কাউকেই প্রবেশ করতে দিল না। বরং দুপুরের পর থেকে ওই রাস্তা দিয়ে যারাই গাড়ি নিয়ে যাতায়াত শুরু করল তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে আরম্ভ করল। এ দিকে রেডিওতে সারেন্ডার করবার ঘোষণা শুনছি আর আমাদের এখানে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা ঘটছে। মা হাবিলদারকে ডেকে বললেন, “তোমাদের নিয়াজী সারেন্ডার করেছে, তোমরাও করো”।’

‘ওর সোজা উত্তর “নিয়াজী কর সকতা হ্যায়, হাম নেহি করেঙ্গে। হামারা পাস এতনা তাগত হ্যায় কে হাম এক ব্যাটালিয়ান কো রোক সকতা।” অর্থাৎ, নিয়াজী সারেন্ডার করতে পারে কিন্তু আমরা করব না। আমাদের যে শক্তি আছে তা দিয়ে এক ব্যাটালিয়ান সৈন্যকে বাধা দিতে পারব।’

বঙ্গবন্ধু পরিবারকে বন্দি রাখা হানাদার বাহিনীর গ্রুপটির আচরণ তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘তাদের গুলি চালানো অব্যাহত রইল। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা সামসুজ্জোহা গাড়ি নিয়ে ১৮ নম্বর রাস্তায় প্রবেশ করতেই তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হলো। তিনি আহত হলেন। কোনোমতে গাড়ি নিয়ে রাস্তা পার হলেন। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এরা যদি রাস্তার দুই প্রবেশমুখ বন্ধ করে দেয় তাহলে আর কোনো গাড়ি ঢুকতে পারে না। সেটা না করে যারাই আসছে তাদেরই ওপর মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করে চলেছে। সকলেই জানে আমরা এখানে বন্দি। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর সকলেই ভাবছে আমরা মুক্তি পাব। কাজেই দেখা করতে আসছে। মনের আবেগ-উল্লাস তাদের এ পথে নিয়ে আসছে। কিন্তু এখানে যে পৈশাচিক কর্মকাণ্ড ঘটে যাচ্ছে তা অনেকেই বুঝতে পারছেন না। আমরা ঘরের ভেতর নীরব সাক্ষী হয়ে সব দেখছি। খবর পাঠাবারও উপায় নেই। ঘরের বাইরেও যেতে দিচ্ছে না।’

‘ইঞ্জিনিয়ার হাতেম আলী সাহেব ৩২ নম্বর সড়কে আমাদের পড়শি হিসেবে দীর্ঘদিন বসবাস করছেন। তাছাড়া তিনি আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়ও হন। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েই প্রথমে এই রাস্তায় আমাদের এক নজর দেখতে এসেছিলেন। গাড়ি যখন এই রাস্তায় ঢোকে, মনে দ্বিধা ছিল কিন্তু মনের আবেগ চেপে রাখতে পারেননি। ঠিক গেটের সামনে আসতেই ছাদ থেকে মুষলধারে মেশিনগানের গুলি ঝাঁকে ঝাঁকে পড়তে শুরু করল। ড্রাইভার তার জায়গায় মৃত্যুবরণ করল। হাতেম আলী সাহেবের স্ত্রীর হাতে গুলি লাগল। তার পুত্রবধূর মাথার চামড়ায় গুলি লাগল। পানি পানি বলে আর্তচিৎকার শুনে আমরা ঘর থেকে বারান্দায় ছুটে আসতেই আমাদের দিকে রাইফেল তাক করে ওরা “আন্দার যাও, কুছ নেহি হুয়া—ভেতরে যাও কিছু হয়নি” বলে আমাদের ভেতরে পাঠিয়ে দিল। আশে-পাশের বাড়ি থেকে অনেকেই সাহায্যের জন্য ছুটে আসতে চাইল। ছাদ থেকে সোজা গুলি চালাল, তার ওপর গাড়ি হঠাও বলে চিৎকার। গাড়ির ভেতরের আরোহীরা কোনো মতে গাড়ি ঠেলে সরিয়ে নিয়ে গেল। ফোটায় ফোটায় রক্ত রাস্তায় পড়তে লাগল। আমরা অসহায় বন্দি, জানালা দিয়ে সব দৃশ্য শুধু দেখে গেলাম। কালের সাক্ষী হয়ে রইলাম।’

হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের সময়কার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘রেডিওতে আত্মসমর্পণের খবর শুনছি। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। মিত্রবাহিনী ভারত ও মুক্তিবাহিনীর পক্ষে জেনারেল অরোরা উপস্থিত থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জেনারেল নিয়াজীকে আত্মসর্মপণ করালেন। রেসকোর্সে স্বাধীন বাংলার পতাকা বিজয়ের স্বাক্ষর বহন করে উড়ল।’

jagonews24এক ফ্রেমে বঙ্গবন্ধুর পরিবার

‘…কী আনন্দ, কী উল্লাস—চোখে অশ্রু, মুখে হাসি, কণ্ঠে জয় বাংলা ধ্বনি প্রকম্পিত করছে ঢাকা শহর তথা গোটা বাংলাদেশকে। আর আমরা? আমরা নরকে বসে দেখছি হায়েনার শেষ কামড়, শেষ উল্লাস। আমাদের বন্দিশালা তখনো স্বাধীনতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত, তার ওপর তখনো পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে। সামনের রাস্তা দিয়ে কাদেরিয়া বাহিনীর একটি খোলা জিপ ব্যানারসহ স্লোগান দিতে দিতে যাচ্ছিল। উপর থেকে মেশিনগানের গুলি ছুঁড়ল ওরা। রাস্তা থেকে পাল্টা গুলি এল। তাই দেখে রেহানা মুক্তিবাহিনী, মুক্তিবাহিনী বলে জানালায় উঠে হাততালি দিতে শুরু করল আর জয় বাংলা বলে স্লোগান দিল। তাড়াতাড়ি ওকে বকা দিয়ে জানালা থেকে নামালাম। কখন ক্রসফায়ারে পড়ে যায় ঠিক নেই। রাসেল, খোকা কাকা, রেহানা, মা ও আমি জয়কে পালা করে কোলে নিয়ে সময় কাটাচ্ছি।’

‘ওদিকে বুয়া বৃদ্ধা মানুষ। কানেও শোনে না ভালো করে, তার প্রশ্নের শেষ নেই। রমা ও আবদুল ওরাও বয়সে কম। কখন বাসার বাইরে যেতে পারবে, মিছিলে শরিক হতে পারবে সেই প্রতীক্ষায় ছটফট করছে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছে। ওদের গোলাগুলিও বাড়ছে। এই রাস্তা দিয়ে যে কয়টা গাড়ি যাচ্ছে তাতেই সরাসরি গুলি করেছে। একটা গাড়িতে গুলি করবার সঙ্গে সঙ্গে “বাবারে” বলে চিৎকার শুনলাম। গাড়িটা বাসার কোনায় থেমে গেল। তখনো বাতি জ্বলছে। বেশ কিছুক্ষণ গুলি চালাবার পর ওরা চিৎকার শুরু করল “বাত্তি বন্ধ কর, বাত্তি বন্ধ কর” অর্থাৎ বাতি বন্ধ কর। কিন্তু কে করবে? যে করবে তাকে তো গুলি করে হত্যা করেছে, সে খেয়াল নেই। সারারাত গাড়িটা বাতি জ্বালান অবস্থায় পড়ে থাকল। একের পর এক গাড়ি এসেছে আর গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে। আমাদের থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চলছে। আমরা বন্দি কয়টি প্রাণী শুনছি গুলির শব্দ আর আর্তচিৎকার। সারারাত এভাবেই কাটল।’

‘খুব ভোরের দিকে গোলাগুলি থামল। খবর নিয়ে জানলাম হাবিলদার সাব নিন্দ পড়া অর্থাৎ ঘুমুচ্ছেন।’

বিজয়ের একদিন পর ১৭ ডিসেম্বর মুক্তি পায় বঙ্গবন্ধুর পরিবার। সেই বিষয়টি প্রকাশ পায় শেখ হাসিনার লেখায়, ‘আজ ১৭ ডিসেম্বর। সারারাত গুলি চালাবার পর একটু বিরতি। রমা এসে বলল, গেটে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক এসেছিল, পাকসেনারা ওদের ঢুকতে দেয়নি। হাবিলদারটা ঘুমুচ্ছে তাই রক্ষে, নইলে ঠিক গুলি চালিয়ে দিত।’

‘এর মধ্যেই দেখলাম ভারতীয় সৈন্যবাহিনী বাড়িটা ঘিরে ফেলেছে এবং পাক-সেনাদের সারেন্ডার করবার জন্য চাপ দিচ্ছে। হাবিলদারকে ঘুম থেকে তোলা হলো। সে কিছুতেই নমনীয় হবে না। আমরা সব সামনের কামরায় জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে গেট খুব কাছে, অনেক বাকবিতণ্ডার পর পাক-সেনারা সারেন্ডার করতে রাজি হলো। তবে দু’ঘণ্টা সময় চায়। আমরা ভেতর থেকে প্রতিবাদ করলাম। মেজর অশোক নেতৃত্বে ছিলেন।’

‘তাকে চিক্কার করে বললাম, ওদের যদি দু’ঘণ্টা সময় দেয়া হয় তাহলে ওরা আমাদের হত্যা করবে। কাজেই ওরা যেন কিছুতেই চলে না যায়। আমাদের অনুরোধে ওরা ওদের অবস্থান নিয়ে থাকল এবং পাক-সেনাদের আধ-ঘণ্টা সময় দিল।’

আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তে হানাদার সেনাদের ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘এত দুঃখের মধ্যেও মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যে হাসি চেপে রাখা যায় না। গেটে যে সেন্ট্রি দুজন ছিল ওরা দারুণভাবে কাঁপতে শুরু করল। এদিকে আমার মা জানালা দিয়ে ওদেরকে হুকুম দিচ্ছেন। এর মধ্যে একজনের নাম ছিল পায়েন্দা খা। মা ওকে নাম ধরে ডেকে সারেন্ডার করতে হুকুম দিলেন। সে কাঁপতে কাঁপতে পাশের ট্রেঞ্চে ঢুকে গেল। ওর সাথী আগেই ট্রেঞ্চে ঢুকে বসেছিল।’

মুক্ত হওয়ার মুহূর্তের আনন্দ-অনুভূতি উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা লিখেছেন, ‘দরজা উন্মুক্ত। আমরা সব ঘর থেকে ছুটে বারান্দার চলে এলাম, ওরা সব অস্ত্র ফেলে দিয়ে একে একে সারেন্ডার করে গেল। মা সঙ্গে সঙ্গে আবদুলকে হুকুম দিলেন পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে ফেলতে। পতাকাটি নামিয়ে মার হাতে দিতেই মা ওটাকে নিচে ফেলে পা দিয়ে মাড়াতে শুরু করলেন। তারপর ছিড়ে টুকরো টুকরো করে আগুন ধরিয়ে দিলেন। দুই পাশ থেকে জনতার ঢল নামল। সাংবাদিকরা ছুটে এলেন। মুক্ত হবার আনন্দের কান্নায় আমরা সবাই ভেঙে পড়লাম।’

‘চোখে অশ্রু, মুখে হাসি, কণ্ঠে জয় বাংলা ধ্বনি, মনের সবটুকু আবেগ দিয়ে শ্লোগান দিয়ে চলছি—আর প্রতীক্ষায় কাল গুনছি। কখন আপনজনদের কাছে পাব। এ প্রতীক্ষা কেবল আমার নয়, প্রতিটি বাঙালির। তাদের নয়নের মণি মুজিবকে তারা কবে ফিরে পাবে। বিজয়ের এই আনন্দ তবেই তো পূর্ণতা লাভ করবে।’

আপনার মতামত লিখুন :