দেশের সর্ববৃহৎ যুব প্লাটফর্ম “ইয়ূথ কাউন্সিল অব বাংলাদেশ” র তৃতীয় বর্ষপূর্তি

0
149
তরুণরাই একটি জাতির মূল চালিকাশক্তি। তরুণেরা যে পথে হাঁটবেন, দেশের ভবিষ্যতও সে পথেই এগোবে। তাই তরুণদের পথচলা যদি হয় আলোকোজ্জ্বল, তাদের পদক্ষেপ যদি এনে দেয় নবদিগন্তের বার্তা, তবে সে বার্তা দেশকে দেখায় আশার আলো। বাংলাদেশের বিপুল যুবসমাজের রয়েছে অমিত সম্ভাবনা। তরুণসমাজকে কার্যকরী ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে যদি পরিচালিত করা যায়, তবে তা দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। এর জন্য এখন থেকেই সরকার, রাষ্ট্র ও সমাজের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ যুব নেতৃত্ব তৈরিরও যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। এ উদ্দেশ্যেই দেশের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত যুব নেতৃত্ব বিকাশের মানসে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ যুব প্ল্যাটফর্ম “ইয়ূথ কাউন্সিল অব বাংলাদেশ” (ওয়াই.সি.বি)। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই “ইয়ূথ কাউন্সিল অব বাংলাদেশ” যুব নেতৃত্বের বিকাশ, যুব উন্নয়ন, মানবাধিকার, পরিবেশ ও নদী আন্দোলন, বির্তক সহ সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। যার মধ্যে করোনাকালীন সময়ে ওয়াই সি বি’র অসাধারণ ভূমিকা উল্লেখ করার মতো।
২০১৯ সাল থেকে “ইয়ূথ কাউন্সিল অব বাংলাদেশ” মনোযোগ দেয় সারাদেশের যুব নেতৃত্বের সেতুবন্ধন তৈরিতে। একে একে ৮ টি বিভাগীয় কমিটি শেষ করে ওয়াই.সি.বি এখন জেলা কমিটি গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে স্বমহিমায়। বর্তমানে সারা বাংলাদেশের কয়েক শত যুব সংগঠন ও সফল যুব নেতৃত্ব সম্পৃক্ত রয়েছেন “ইয়ূথ কাউন্সিল অব বাংলাদেশ” এর সাথে।
(ওয়াই.সি.বি.)’র মূল উদ্দেশ্যেই হচ্ছে সারা বাংলাদেশের যুব প্রতিনিধি ও যুব নেতৃত্বদানকারী যুব সমাজের মাঝে সৌহার্দ্যের সেতুবন্ধন তৈরী করে বৈষম্যহীন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে সারা বাংলাদেশের যুব সমাজ তাদের নিজ নিজ সংগঠন ও স্ব স্ব যুব নেতৃত্বের কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে পারে।
ইয়ূথ কাউন্সিল অব বাংলাদেশ (ওয়াই.সি.বি)’র প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশের তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়ে যুব নেতৃত্বদানকারী যুব নেতা ও যুব প্রতিনিধিদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে যুব উন্নয়নের পাশাপাশি যুব কর্মকাণ্ড, প্রশিক্ষণ, জনসংযোগ ও কর্মসংস্থানের সু্যোগ সৃষ্টি করা। প্রতিবছর জাতীয় যুব সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে যুব সংগঠন, যুব নেতা, যুব প্রতিনিধিদের কার্যক্রম, সাফল্য, ব্যার্থতা মূল্যায়ন ও সংকট, সমস্যা সমাধানে কার্যকরি ব্যাবস্থা গ্রহণ এবং আগামীর যুব কার্যক্রমের এজেন্ডা নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা। একইসাথে বিভাগীয় সম্মেলন (বাংলাদেশ ট্যুর) আয়োজনের মাধ্যমে প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা কমিটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করে যুব উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও বিভাগীয় পর্যায়ে আগামী দিনের এজেন্ডা গ্রহণ ও ব্যাস্তবায়ন করা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অবদান রাখা যুব সংগঠন ও যুব নেতাদের পুরস্কৃত করা।
সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সক্রিয় যুব সংগঠন ও যুব নেতা, যুব প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড বিনিময়ের ব্যবস্থা করা, সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং স্বনামধন্য গণমাধ্যম সমূহে তুলে ধরার ব্যবস্থা করা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে সহযোগিতা করাও ওয়াই.সি.বি. এর অন্যতম লক্ষ্য। জাতীয় যুব সম্মেলনের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য আন্তরিক দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ যোগ্য যুব সংগঠন ও যুব নেতাদের প্রতিবছর Youth Council of Bangladesh (YCB YOUTH AWARDS) প্রদান করা হবে।
সমকালীন উদ্ভুত যেকোনো পরিস্থিতি (সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক) মোকাবেলায় যুবাদের আন্তরিক করে তোলার জন্য ওয়াই.সি.বি. কাজ করে যাবে। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালার মাধ্যমে যুবকদের মধ্যে দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা, বিভিন্ন পর্যায়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সেবামূলক যুব সংগঠনের কার্যক্রম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরার মাধ্যমে যুব নেতা, যুব সংগঠকদের অনুপ্রাণিত করাও ওয়াই.সি.বি. এর লক্ষ্য। ওয়াই.সি.বি. মূলত দেশের যুব নেতৃত্বের মধ্যে একটি নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য কাজ করছে যার ফলে তৃণমূল থেকে শীর্ষস্থানীয় যুব নেতৃত্ব তাদের কাজগুলোকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়ে ভালো কাজগুলোকে অর্জন আর মন্দ কাজগুলোকে বর্জন করে যুব বিনিময়ের মাধ্যমে স্বীয় কর্ম পরিধি বৃদ্ধি করে নিজেকে মেলে ধরবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, নিজেকে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়; বুঝে নিবে তার প্রাপ্য সম্মান আর স্বীকৃতি।
বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার ৬০ ভাগ মানুষ ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। ২০৩০ সাল নাগাদ সেটি ৭০-৭৫ শতাংশে উন্নীত হবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীই একসময় দেশের সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দান করবে। তাই এখন থেকেই তাদেরকে আগামীর জন্য প্রস্তুত করে গড়ে তুলতে হবে। বিপুল সংখ্যার এই কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার বাড়ছে। সারাদেশে উচ্চশিক্ষার হারও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। প্রতিবছর হাজার হাজার গ্রাজুয়েট তৈরি হচ্ছে দেশজুড়ে। কিন্তু তাদের সকলের জন্য সমান কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। তাই কিছু বিকল্প ব্যবস্থাও গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তরুণদেরকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে, যাতে তারা পড়াশোনা শেষ করেই নিজের অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা করতে পারে৷ আমাদের দেশের অনেক তরুণই উচ্চশিক্ষার পর্যায় শেষে বিদেশে পাড়ি জমান এবং সেখানেই স্থায়ী হন। এতে করে দেশের জনসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তরুণদের এই প্রবণতা রোধের জন্য কার্যকরী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাদের এই প্রবণতার কারণ বের করতে হবে এবং দেশের সম্পদ যাতে দেশেই থাকে সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে। দেশের যুবসমাজ যেন দেশে থেকেই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণা কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে, সে সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। এজন্য গবেষণাখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা দরকার৷ একইসাথে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারকে মনোনিবেশ করতে হবে এবং প্রয়োজনবোধে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যুবসমাজের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ মাদক। মাদকের সর্বগ্রাসী প্রভাবে দেশের যুবসমাজ বিপথে পরিচালিত হচ্ছে৷ এজন্য মাদকবিরোধী আন্দোলনকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে এবং মাদকের অবাধ প্রসারকেও প্রতিহত করতে হবে। এর সাথে সাথে তরুণদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্সেলিং এরও ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’ এই প্রবাদ বাক্যটির বাস্তব প্রমাণ আমরা দেখতে পাই এ দেশের তরুণ সমাজের মাঝে। কাজ বা শিক্ষার অভাবে তরুণদের অনেকেই সামাজিক অপরাধসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। এ পথ থেকে তরুণদের ফিরিয়ে আনতে হলে তাদের জন্য কর্মক্ষেত্র এবং সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা সৃষ্টি করা প্রয়োজন৷ প্রতিটি পাড়া, মহল্লা, এলাকায় তরুণদের জন্য পাঠাগার, সামাজিক ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তরুণ সমাজকে বৃক্ষরোপণ, অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণ, পথশিশুদের পাঠদানের মতো সামাজিক কাজে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এর ফলে যুবসমাজের অবসর যেমন ইতিবাচকভাবে কাটবে, তেমনিভাবে এ সমস্ত সামাজিক কাজের মাধ্যমে সমাজও উপকৃত হবে।
দেশের যুবসমাজকে জনশক্তিরূপে ব্যবহার করতে হলে তরুণদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এটি করা সম্ভব হলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ উন্নত দেশের তালিকায় স্থান লাভ করবে। যুবসমাজকে সঠিকপথে পরিচালিত করা গেলে শিক্ষা, শিল্প, অর্থনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে লাভবান হবে দেশ। আর এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ যুব নেতৃত্ব। যুবসমাজের নেতৃত্ব যদি দৃঢ় হয়, তবেই তারা সঠিকপথে পরিচালিত হবেন। এ লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে ওয়াই.সি.বি.। সারাদেশের সকল যুব নেতাদের কাজের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে ওয়াই.সি.বি. প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আপনার মতামত লিখুন :