অধিকাংশ প্রতিবন্ধী রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত : টিআইবি

0
16

প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ঘাটতি থাকায় দেশের অধিকাংশ প্রতিবন্ধী মৌলিক মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এছাড়া রাষ্ট্রীয় বাজেটে প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ অর্থ বাস্তবসম্মত ও যথেষ্ট নয় এবং যে বরাদ্দ দেয়া হয় তাও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে যথাযথভাবে তাদের কাছে পৌঁছায় না।

বৃহস্পতিবার (১১ ফেব্রুযারি) এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে ‘উন্নয়নে অন্তর্ভুক্তি এবং প্রতিবন্ধিতা : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে এসব তথ্য জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, পরিবহন, সার্বিক অবকাঠামো, সম্পদের ওপর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতির কারণে উন্নয়নে প্রতিবন্ধীদের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে বলেও মনে করে সংস্থাটি। এছাড়া সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর নিয়মিত তদারকি ও নিরীক্ষা না হওয়ায় সেবা প্রদান কার্যক্রমে অনিয়ম-দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ঘাটতি থাকায় অধিকাংশ ব্যক্তি মৌলিক মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

টিআইবি আরও জানায়, প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে অন্তর্ভুক্তিতে সুশাসনের চ্যালেঞ্জসমূহ চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। মূলত গুণগত পদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষেত্রবিশেষে সংখ্যাগত তথ্যও সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য সুশাসনের সাতটি নির্দেশক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সমন্বয়, অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সংবেদনশীলতা ও অনিয়ম-দুর্নীতিসহ সংশ্লিষ্ট উপ-নির্দেশকের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন- ২০১৩, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩, এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও এগুলোর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন- প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ আইনটি কোনো কোনো আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে তা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। এর ফলে ‘লুনেসি’ আইনে মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিরা উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদ পাবে না উল্লেখ থাকায় বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উত্তরাধিকার সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকায় ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ বাস্তবায়নে প্রণীত কর্মপরিকল্পনা অগ্রসরে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। জাতীয় বাজেটে সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে আলাদাভাবে বরাদ্দ রাখা হয়নি, বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যয় হলেও সেটা এ খাতের প্রকৃত বরাদ্দ কি না তা স্পষ্ট নয়। সামাজিক সুরক্ষার আওতায় মাসে ৭৫০ টাকা করে ১৮ লাখ প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেয়া হচ্ছে, যা জীবনধারণের চাহিদা পূরণে এবং প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা বিবেচনায় অনেক কম। অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ ও বিশেষায়িত সেবা প্রদানের ব্যবস্থা নেই। প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নতা রয়েছে।

গবেষণার ফলাফলে আরও দেখা গেছে, সমাজসেবার কার্যালয়সমূহে এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে জনবলের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। দৃষ্টি, বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে জনবল এবং সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে তত্ত্বাবধায়ক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসহ অন্যান্য জনবলের চাকরি নিয়মিতকরণের অনুমোদনে ফাউন্ডেশন ও মন্ত্রণালয় কর্তৃক দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যায়। ফলে প্রতিবন্ধীদের নিয়মিত পাঠদান কম গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে থেরাপিস্ট এবং থেরাপিস্ট সহকারীদের একাংশের থেরাপি সংক্রান্ত বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ও প্রযুক্তিগত উপকরণ ব্যবহারে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে অনেক ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ টিনশেড ভবনে পাঠদান কার্যক্রম হয়। অনেক বিদ্যালয়ে সংলগ্ন মাঠ নেই, এবং থেরাপির জন্য ব্যবহৃত অধিকাংশ মেশিন অকেজো। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী বিদ্যালয় নেই- সরকারি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় পাঁচটি, সরকরি বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় আটটি, এমপিওভুক্ত বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয় জেলার সদর উপজেলাকেন্দ্রিক।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উন্নয়নে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিতের ধারণা ও অঙ্গীকার প্রতিবন্ধিতাসহ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আমাদের প্রেক্ষাপটে যে প্রযোজ্য নয়, তার বাস্তব চিত্রটা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আইন-নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষেত্রবিশেষে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে গৃহীত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, তা বলা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় বাজেটে এ খাতের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে কিছু ব্যয় করা হয়, কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত ও সমন্বিত নয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওপর মূল দায়িত্ব, কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা দেখছি, মুদ্রাস্ফীতি ও প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা বিচারে কিছু বরাদ্দ সাম্প্রতিককালে বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রয়োজনের তুলনায় তা পর্যাপ্ত ও অন্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বিত নয়। জাতিসংঘ সনদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিবন্ধীদের সংগঠনসমূহ পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ থাকার কথা, সেটা আমাদের এখানে নেই। প্রতিবন্ধী ভাতা যেটা দেয়া হয়, সেটির পরিমাণ খুবই নগণ্য এবং তার আওতায় প্রায় ১৬ শতাংশ প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্ত নয়।

গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে ১৪ দফা সুপারিশ প্রস্তাব করছে টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান এবং গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক শাহজাদা এম আকরাম, সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার, গবেষণা ও পলিসি বিভাগ। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ফারহানা রহমান।

এছাড়া গবেষণা দলের সদস্যদের মধ্যে আরও ছিলেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রাক্তন প্রোগ্রাম ম্যানেজার দিপু রায় এবং ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার নিহার রঞ্জন রায়। সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম।

আপনার মতামত লিখুন :