নারী উদ্যোক্তা: আছে সুযোগ, সম্ভাবনাও উদ্যোক্তা নারী'র নারী দিবসে প্রত্যাশা

0
202

নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিতে কার না ভালো লাগে! বর্তমান সময়ের সবচেয়ে চাহিদার কিংবা আকর্ষণের একটি কাজ হচ্ছে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। ব্যবসা কিংবা চাকরি যেকোনো জায়গাতেই মানুষ চায় নিজেকে কিছুটা আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে। তাই তো  বর্তমান সময়ের তরুণ তরুণীদের আকর্ষণের একটি জায়গা হচ্ছে নিজেকে উদ্যোক্তার আসনে দেখা।

‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’-এ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রতিবছরের মতো এবারও সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীদের জন্য এটি বিশেষ একটি দিন। নারী দিবসে নারী উদ্যোক্তাদের ভাবনা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন আহমেদ স্বাধীন…..

জান্নাত সুলতানা, উদ্যোক্তা, সিজনস বুটিকানো

আমার জন্য প্রতিদিন নারী দিবস। একজন  নারী হিসেবে আমি সর্বদা গর্বিত। আমার বাবা মায়ের ছেলে ছিলো না।  আমাদের তিন বোনকে তিনি গড়ে তুলেছেন সত্যিকারের মানুষের মতো করে। মেয়ে বা ছেলে নয়। আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন। তাই আজ তিনজন এর কেউ বাবা মায়ের বোঝা নয়। পড়াশোনা ও চাকরী করার পাশাপাশি সেলাই কাজ,  টিউশনি করা আসলে কোন ব্যপার ছিলো না। সব সিচুয়েশনে চলার ক্ষমতা রাখতাম। পড়াশোনা শেষে  বাবার সংসার থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি শ্বশুর বাড়ি। যেদিন সংসারে ঢুকলাম সেদিনই টের পেলাম আমার স্বামী আমার বাবার মতোই আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছেন।  ব্যবসার জন্য তৈরি করেছেন ১৪ বছর আগে। আমি ট্রেনিং এ গেলে বাচ্চাদের দেখাশুনা থেকে শুরু করে খাওয়ানো সব নিজ হাতে করতেন। অসুস্থ হয়েও তিনি আমাকে কখনো পিছু ডাকেন নি। তিনি চলে গেছেন ওপারে। তবে  আমাকে একজন গর্বিত নারী ও দুই মেয়ের গর্বিত মা হিসেবে পৃথিবীতে রেখে গেছেন।
এই নারী দিবসে আবার ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম আজ থেকে আবার শুধু নিজেকে ভালোবাসবো, নিজেকে তৈরি করবো এবং সিজনস্ ও সন্তান হবে আমার পরিচয়। আর কিছু নয়। আর কেউ নয়।
রুনা আহমাদ
উদ্যোক্তা, হোমমেড দেশিপন্য
৮ই মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। এটা একটা প্রতিপাদ্য বিশেষ দিন হতে পারে। তবে আমার কাছে রোজ নারী দিবস। নারীদের মর্যাদা ও কর্মক্ষমতা কিন্তু ভাবনারও অতিত। নারীদের সামাজিক পারিবারিক ও ব্যক্তিগত অবস্থান আল্লাহতায়ালা এমন ভাবে আমাদেরকে তৈরি করেছেন যে জীবনের একটা দিনও আমাদের ছাড়া সমাজ গঠন অসম্ভব। একটা নারী প্রয়োজন অনুসারে বহুরুপে আবির্ভুত হয়। আমার কাছে মনে হয় নারী হচ্ছে তরল পানির মতো। তাকে যে পাত্রে রাখা হবে সে সেই পাত্রেই অবস্থান করতে পারে সাবলীলভাবে।
একটা সময় সমাজে নারীদেরকে অত্যন্ত অবহেলার চোখে দেখা হতো। সময় পাল্টেছে। এখন বৈষম্যমুলক মনোভাব থেকে উঠে এসেছে অনেক পুরুষ। তবে এখন আমরা, মানে নারীরা যদি যার যার অবস্থান থেকে আরো একটু সচেতন হতে পারি। তবে সর্বস্তরে আমাদের মর্যাদা আদায় করে নেয়া কঠিন হবে না। এখন প্রযুক্তির সাথে নিজেদেরকে এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অসংখ্য নারী অফিস আদালতে গিয়ে কাজ করতে না পারলেও ঘরে বসে আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছে। এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে সাবলম্বি হবার চেষ্টা করতে হবে সকল নারীকে। তবে আসবে সাফল্যর আনন্দ। নারী দিবস একদিন নয়। প্রতিদিন।
ফৌজিয়া 
উদ্যোক্তা, ফেলিসিটি
“আমরা নারী আমরাই পারি”
সেই আদিম যুগ থেকে এখন পর্যন্ত নারীরা অবহেলিত। নারীদের স্বাধীনতা, অধিকার সব জায়গায় বাধা। এখনো শিক্ষিত নারীরা অবহেলিত হচ্ছে পুরুষশাষিত সমাজের কথার মাধ্যমে। এখনো যেন নারীরা স্বাধীনতার নিশ্বাস নিতে পারছে না। শিক্ষিত বা অশিক্ষিত সবাই অত্যাচারের স্বীকার। শুধু অত্যাচারের ধরন আলাদা। এখন সময় এসেছে নারীদের  নিজেকে বদলে নেয়ার। আমরা এখন আর অবহেলিত হব না। এখন আমাদের মাথা উঁচু করে পায়ের নিচের মাটি শক্ত করার সময়। আমি একজন নারী হয়ে অনলাইনে একটি উদ্যোগ  শুরু করেছি২০১৬ সালে।  আমার উদ্যোগে তেমন কোন বাঁধার মুখোমুখি হতে হয়নি। কারন আমার পরিবার আমার পাশে আছে সবসময়ই।
আমার মনে হয় নারীদের পরিবার যদি তাদের পাশে থাকে তাহলে কোন কাজেই অসম্ভব না। আমরা নারীরা কোন দিক থেকে পিছিয়ে নেই। তাই হাজারো নারী আজ কাজ করছে। শুধু মনের জোর নিয়ে কাজ করতে হবে। আমি চাইলে সব কাজ সুন্দর ভাবে করতে পারি। এই আমিটাকে বের করতে হবে। তবেই নারী স্বাধীনতা পাবে। নারী দিবসে আমি আমার উদ্যোগ নিয়ে স্বপ্ন দেখি একদিন আমার উদ্যোগ সকল বাঁধা পেরিয়ে এগিয়ে যাবে। সেখানে কাজ করবে আমার মত হাজারো নারী।
তামান্না ইসলাম ত্বোয়া
উদ্যোক্তা, বাহারি খাবার ঘর
নারী দিবসের উদ্দেশ্য হলো নারী স্বাধীনতা ও সর্বক্ষেত্রে তাদের অধিকারের মূল্যায়ন করা৷ নারী যুগ যুগ ধরে অবহেলিত৷ তারা পুরুষশাষিত সমাজের কথার মাধ্যমে, মনোভাবের মাধ্যমে পদদলিত হয় প্রতিনিয়ত৷ নারীদের কথা বলতে মানা, সিদ্ধান্ত দিতে মানা, প্রতিবাদ করতে মানা এমন কি উপার্জন করাতে ঘোর মানা৷ পুরুষ, সে তো নারীকে নিষ্পেষিত করবে এটাই চলে এসেছে কিন্তু নারী যখন নারীকে হেয় করে তখন সেটা মেনে নেয়া আরো কঠিন৷ নারী হচ্ছে নারীর প্রতিদ্বন্দী৷ আর পুরুষ… আমি পুরুষ, আমি সর্বেসর্বা, আমার কথাই শেষ কথা৷ আমার পেশীর জোর বেশি, আমার কথা নামক অস্ত্র অনেক ধারালো৷ তাই তুমি অসহায়, অবলা, দুর্বল চিত্তের নারী… মাথা নত করে থাকো, চোখ রাখো মাটিতে!!!
আমি নারীবাদী কিনা জানি না
তবে আমার জানতে চাওয়া এই যে অনিয়ম নামের নিয়ম কবে কে তৈরি করে দিল৷ যে কোন ধর্মে নারীকে অনেক উপরে স্থান দেয়া হয়েছে৷ তাদের অনেক মর্যাদা দেয়া হয়েছে৷ তবে কোন যুক্তিতে কোন লিখিত নিয়মে নানাভাবে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে৷ একজন নারী নয় সাধারণ মানুষ হিসেবে বলছি জেগে উঠ নারী৷ নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত কর৷ বাবার নামে, স্বামীর নামে, সন্তানের নামে পরিচিত হওয়া ছাড়াও নিজের নামে পরিচিত হও৷ শিরদাড়া সোজা করে দাঁড়াও৷ জীবন তো একটাই৷ সে জীবন হোক অর্থবহ। নিখাদ ভালোবাসা পাক নারী তথা মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা৷
মমতাজ বেগম।
উদ্যোক্তা, আলভি ফ্যাশন হাউস
উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করার বাধা বা বৈসম্যর সমমুখীন হইনি আমি। পরিবারের  সাপোর্ট  আছে বিধায় তেমন কোন অসুবিধায় পড়তে হয়নি। নারী হিসেবে সব সময় ই  চাইব নিজেকে এগিয়ে  নিয়ে যেতে বহুদূর। সমাজে নিজের আলাদা একটা পরিচয় গড়ে তুলতে চাই। নিজের উদ্যোগ কে নিয়ে কাজ করে যাব আরো দশজন নারীর কর্ম সংস্থান গড়ে তুলতে চাই। অলরেডি ৩০ জন নারী কাজ করছে আমার উদ্যোগে।আমার হাতের কাজের শাড়ি  আর থ্রি পিস। সারাদেশে ছড়িয়ে যাক্। ইতিমধ্যই  ঢাকা নারায়নগঞ্জ বরিশাল রাজশাহী  চুয়াডাঙ্গা পঞ্চগড় খুলনা সহ আরো কয়েকটি  উপজেলায় ডেলিভারি দিয়েছি আমার পন্য। আমি বিশ্বাস করি নারীরা অনেক কিছু করতে পারে। আমি একজন শিক্ষিকা। এক হাতে সংসার, চাকরি ও উদ্যোগ সামলাচ্ছি আমি। আমাদেরকে আরো এগিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার সকলের সহযোগিতা।
সাদিয়া আফরিন 
উদ্যোক্তা, কইন্যা বরণ
গতবছর এপ্রিল এ করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি তে যখন সবাই গৃহবন্দি হয়ে পড়লাম। তখন থেকে শুরু আমার উদ্যোগ। ই কমার্সে হাজারো নারীর কাজ আর তাদের গল্প গুলো পড়ে আমার এই উদ্যোক্তা জীবন শুরু । কাজ শুরু করি নিজের হাতের তৈরী পিঠা নিয়ে। যেখানে আমার সহযোগী ছিলেন আমার মা আর আমার ছোট বোন। আমরা খুব সুন্দর নকশী পিঠা বানাতে পারি, তাই এটাকেই মূলধন বানালাম। সাথে পিঠার আরো বেশ কিছু আইটেম ছিল। আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো সাড়া পেয়েছি। এমনকি সবাই খুব পছন্দ করে আমার পিঠা।
আজ বিশ্ব নারী দিবস। সকল নারীদের জানাই নারী দিবসের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। আর নয় অবহেলা , আর নয় নির্যাতন। এই নারী দিবসে সকল নারীদের আহ্বান করছি। কেও যেন নিজেকে অসহায় মনে না করে। আমার ইচ্ছে ,,আমি নারীদের জন্য এমন কিছু করবো যেখানে তারা তাদের সকল অত্যাচার অবিচার ও নির্যাতনের সঠিক বিচার পাবে এবং নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারবে ।
আপনার মতামত লিখুন :