পঞ্চাশে শুরু হলো বাংলাদেশের প্রাণকাল: দ্য ডিপ্লোম্যাট

0
179

শেখ হাসিনার হাত ধরে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ক্রমেই হয়ে উঠছে দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতির অন্যতম পরাশক্তি। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে যেন নতুন জীবন পেয়েছে লাল-সবুজের দেশটি। আজ কান পাতলেই শোনা যায় তার গুণগান। গত সোমবার বাংলাদেশকে নিয়ে বিশাল একটি কলাম প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট। লিখেছেন বিবিসি ও রয়টার্সের সাবেক প্রতিনিধি এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক সুবীর ভৌমিক।

‘ফর বাংলাদেশ, লাইফ বিগিনস অ্যাট ৫০’ শিরোনামে প্রকাশিত কলামটিতে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে বলা হয়েছে, গত ৫০ বছর ধরে দেশটি ক্রমাগত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আজ বিভিন্ন দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার নেতা হিসেবে উদীত হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, আগরতলার বাসিন্দা প্রসেনজিৎ পাল কিশোর বয়সে বাড়ির ছাদ থেকে দেখতেন, প্রতিরাতে খাদ্যভর্তি ট্রাক বাংলাদেশে যাচ্ছে। তার কথায়, ‘বাংলাদেশিদের দরকারি প্রায় সবই নিয়ে যেত পাচারকারীরা।’

এখন ৫০ বছর বয়সেও ট্রাক যেতে দেখেন প্রসেনজিৎ। তবে সেগুলোর দিক বদলেছে। এখন বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে গার্মেন্টস, ইলেক্ট্রনিক পণ্য, খাবার নিয়ে উল্টো আগরতলায় ঢোকে ট্রাকগুলো।

উত্তর-পূর্ব ভারতের এ বাসিন্দা বলেন, আমার শহর পুরোপুরি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। যখনই সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ হয়, আমরা দুর্ভোগে পড়ি।

স্কুলজীবনে প্রসেনজিৎ পাল যে বাংলাদেশকে জানতেন, তা ছিল হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। জন্মের ৫০ বছর পর আজ বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে ‘দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতির দুরন্ত ষাঁড়’। এমনকি অনেকেই এর রফতানিমুখী প্রবৃদ্ধিকে দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করছেন।

jagonews24

দ্য ডিপ্লোম্যাটের কলামে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তানের কাছ থেকে কষ্টার্জিত স্বাধীনতা পায় বাংলাদেশ। এসময় অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে ১৯৭০-এর দশকে দরিদ্র দেশের তালিকায় একেবারে তলানিতে ঠাঁই হয় তাদের।

তবে একসময় আফ্রিকার যেসব দরিদ্র দেশের সঙ্গে তুলনা করা হতো, এখন ২০২০ সালে মাথাপিছু জিডিপি ১ হাজার ৮৮৮ ডলার নিয়ে বাংলাদেশ তাদের চেয়ে অনেক অনেক ওপরে উঠে এসেছে।

২০১৯ সালে দেশটির প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে। যদিও করোনাভাইরাস সংকটে সেই গতি কিছুটা কমেছে, তারপরও অনেকটা পরিমিত গতিতে তাদের প্রবৃদ্ধি চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সবশেষ তালিকায় মাথাপিছু জিডিপিতে প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে একধাপ ওপরে রাখা হয়েছে বাংলাদেশকে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতের জিডিপি যেখানে ১০ শতাংশ কমে যাবে, সেখানে বাংলাদেশের প্রায় চার শতাংশ বাড়বে।

বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক সুখরঞ্জন দাশ গুপ্ত দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, এটা কি উদযাপনের কারণ নয়! একসময় দুর্যোগের জন্য কুখ্যাত দেশটি এখন স্থিতিস্থাপক পরিবর্তনের উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

এর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাপ্য! এক্ষেত্রে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকীটি।

jagonews24

পত্রিকায় নিজের কলামে মাহফুজ আনাম লিখেছিলেন, তিনি (শেখ হাসিনা) দেশকে একটি সংক্রামক আত্মবিশ্বাস দিয়েছেন যে, আমরা করতে পারি।

অনাহার থেকে খাদ্য নিরাপত্তা
১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের স্মৃতি পেছনে ফেলে বাংলাদেশ তার ১৬ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ২০২০ সালে বাংলাদেশ ১৩ ধাপ ওপরে উঠে ৭৫তম স্থান অর্জন করেছে, যা ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রায় তিনগুণ বেড়ে ২০১৯-২০ সালে ২ হাজার ৬৪ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে চরম দরিদ্র্যদের সংখ্যা জনসংখ্যার প্রায় ১৯ শতাংশ থেকে কমে নয় শতাংশের নিচে দাঁড়িয়েছে। এ কথা বলছে খোদ বিশ্বব্যাংক।

৫০ বছর বয়সে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত উদযাপন করছে। সম্প্রতি তাদের ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ (এলডিসি) থেকে ‘উন্নয়নশীল দেশ’র স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ।

বাংলাদেশের সাবেক তথ্য ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের স্বীকৃতি আমাদের একধরনের শক্তি ও আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। তার ধারণা, করোনা মহামারির প্রভাবে ২০২১ সালে বাংলাদেশের ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব না হলেও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স সরকারের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে।

jagonews24

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শিল্পের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এই খাতে অন্তত ৫০ লাখ মানুষ কাজ করছে। দেশের মোট রফতানির ৮০ ভাগই আসছে গার্মেন্টস শিল্প থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানি ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও ২০২০ সালে বৈশ্বিক মহামারির প্রভাবে বার্ষিক রফতানি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৩৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে হাসিনা বাহিনী বিশ্বাস করে, এটি দ্রুতই আগের গতিতে ফিরে আসবে।

সাফল্যের চাবি গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্সে
২০২০ সালে বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য রফতানি ১৭ শতাংশ কমে ২৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়, তবে শঙ্কার মেঘ বাড়তে দেননি অভিবাসী বাংলাদেশি কর্মীরা। গত বছর তারা ২১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন, এর প্রায় ১০ শতাংশ এসেছে এক ডিসেম্বর মাসেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান বলেন, করোনা মহামারির মধ্যেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্স।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের কলামে সুবীর ভৌমিক লিখেছেন, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই শেখ হাসিনা এবং যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা তার ছেলে ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’র সূচনা করেন। গত তিন বছরে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প ছয়গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের ৮০০ মিলিয়ন ডলারের এই শিল্পের বর্তমান আকার প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার। ঢাকার তরুণ নির্বাহীদের বিশ্বাস, তাদের দেশ তথ্যপ্রযুক্তি ও ফার্মাসিউটিক্যাল উভয় ক্ষেত্রেই ভারতকে পেছনে ফেলবে।

jagonews24

শেখ হাসিনা ক্ষমতাগ্রহণের আগে ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ছিল মাত্র ৯৬১ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। এর পরিমাণ আরও বাড়াতে ১০০টি বিশেষ অর্থনেতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে সিঙ্গাপুর-ভিয়েতনামের মতো ‘ওয়ান-স্টপ’ সেবা দিতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) গড়ে তোলা হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ দুর্নীতির
বাংলাদেশকে আরও উন্নতি করতে তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে বলেছেন আতিউর রহমান- দুর্নীতির মূলোৎপাটন, অর্থপাচার বন্ধ এবং ব্যাংকের সমস্যা চিহ্নিতকরণ।

তিনি বলেন, আমরা এগুলো কার্যকরভাবে সামাল দিতে পারলে জিডিপি এক শতাংশ বাড়তে পারে। অর্থনৈতিক দুর্নীতি বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধে নামতে হবে।

কিছু শঙ্কা থাকলেও এই মুহূর্তে বাংলাদেশের উদযাপন করার মতো অনেক বিষয় রয়েছে- স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা নদীর ওপর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সেতু নির্মাণ। সেতুটি চালু হলে দক্ষিণের ২১টি জেলাকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সংযুক্ত করবে এবং দেশের জিডিপি এক শতাংশ বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।

তারানা হালিম বলেন, আমরা বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীকে ছুঁড়ে ফেলেছি, শক্তিশালী পদ্মা আয়ত্তে এনেছি। আমরা আরও বহুদূর এগিয়ে যাব।

তার মতে, সামাজিক আধুনিকায়ন ও মানব উন্নয়ন, বিশেষ করে লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতায়ন না হলে বাংলাদেশের এমন অর্থনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হতো না।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুও এ বিষয়ে একমত। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশই ১৫ বছরের কম বয়সী এবং অর্ধেক নারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশটির প্রবৃদ্ধি মডেল অন্তর্ভুক্তিকর। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়নের মতো ক্ষেত্রগুলোতে তৃণমূল পর্যায়ে মানব উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :