নারীদের হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের প্রযুক্তি খাত

0
181

(১)
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যেখানে ফাইভজি ইকোসিস্টেম তৈরির লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ অনেক জায়গায় ইন্টারনেট ব্যবহার এখনো ব্যাহত হচ্ছে। অনুন্নত অবকাঠামো এবং ইন্টারনেটের অধিক খরচসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে ‘পোর্টেবল ওয়েব ইন এ বক্স’ আইডিয়ার মাধ্যমে। আইডিয়াটি হচ্ছে, একটি পোর্টেবল প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে সার্ভারে সংরক্ষিত থাকবে শিক্ষামূলক বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং লোকাল (অফলাইন) ওয়্যারলেস সংযোগের মাধ্যমে ব্যবহার করা যাবে এসব ওয়েবসাইটের কনটেন্ট।

(২)
বৈশ্বিক মহামারিসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় শিক্ষার্থীরা যাতে ইন্টারনেটে অনায়াসে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, সেজন্য বাস্তবায়িত হতে পারে ‘ফ্লোটিং ইন্টারনেট’ আইডিয়া। অনলাইন ক্লাসের জন্য নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক সুবিধা প্রদানে কাজে লাগবে এই অসাধারণ আইডিয়াটি। কিংবা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ সমস্যা সমাধানে ‘স্মার্ট ইলেকট্রিক গ্রিড : ফিজিবিলিটি স্টাডি অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আইডিয়ার কথা বলা যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করতে স্মার্ট গ্রিডে রয়েছে অটোমেশন, স্মার্ট অ্যাপ্লায়েন্সে, স্মার্ট মিটার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি সম্পদ।

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সমাজের বিদ্যমান নানা সমস্যা সমাধানে এ আইডিয়াগুলোর স্বপ্নদ্রষ্টা হচ্ছেন আফসারা বেনজির, তাসনিয়া সুলতানা, ফারিয়া রহমান এবং তাদের দল।

(৩)
পৃথিবীজুড়েই যুগ যুগ ধরে মনে করা হতো নারীরা কেবল সেবামূলক খাতে (যেমন- নার্সিং, শিক্ষকতা ইত্যাদি) কাজ করার ক্ষমতা রাখে। সত্তর দশকের শেষে সেবামূলক খাতে অধিক সংখ্যক নারীর অংশগ্রহণের ফলে এই খাতে কাজ করা কর্মীদের আখ্যা দেয়া হয় ‘পিংক কলার ওয়ার্কার’ নামে। তবে সময় এখন বদলেছে। একসময় যেখানে নারীকে প্রকৃতি আর পুরুষকে সংস্কৃতির রূপদানকারী বলা হতো, সেই নারী এখন সমাজ ও সংস্কৃতি গঠনে পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সব জায়গায় অংশগ্রহণ করছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রারম্ভে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের নারীরাও বিভিন্ন খাতে দেশ ও দেশের বাইরে কাজ করে অর্জন করছে অসামান্য সাফল্য।

আধুনিক যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তি খাত। তাই গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশ সরকারও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এ খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক যেখানে নারী, সেখানে নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ ব্যতীত ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্পের বাস্তবায়ন নিছক কল্পনা। ১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকা বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে পথে। এ সময় নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া দেশে দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক জনশক্তির অভাব পূরণ করা কখনোই সম্ভব নয়।

আশার কথা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তি নারীকে তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় যেমন এগিয়ে নিয়ে যায়, তেমনি তার ক্ষমতায়নেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজন সার্বিক সহযোগিতা, এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্র এবং ভবিষ্যৎ দক্ষতা গঠনে শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ, যা দেশে বিশাল তরুণ নারী জনগোষ্ঠীকে সহায়তা ও উৎসাহিত করবে তথ্যপ্রযুক্তিখাতের মতো সম্ভাবনাময় খাতের সাথে সম্পৃক্ত হতে এবং প্রশস্ত করবে ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রাপথ।

আশার কথা হচ্ছে, এক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো কিছু উদ্যোগ ইতিমধ্যেই গ্রহণ করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মেধা বিকাশের লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ তথ্যপ্রযুক্তিখাতে নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় হুয়াওয়ে টেকনোলজিস লিমিটেডের ‘সিডস ফর দ্য ফিউচার’ আয়োজনের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ২০১৪ সালে শুরু হওয়া এই আয়োজনে বিজয়ী করা হয় পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দশটি দল, যেখানে প্রতিটি দলেই নিশ্চিত করা হয় নারীদের অংশগ্রহণ। যারা চীনের হুয়াওয়ের কার্যালয় পরিদর্শনসহ সংশিষ্ট বিষয়ে নানা প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পায়, যার মাধ্যমে তারা শাণিত করতে পারে তাদের মেধা, ঝালিয়ে নিতে পারে দক্ষতা, নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য।

গত বছর এই আয়োজনের সপ্তম আসরে অংশ নেন আফসারা বেনজির, তাসনিয়া সুলতানা, ফারিয়া রহমান, আদিবা তাবাসসুম চৌধুরী, এবং রাবেয়া তুস সাদিয়া। মেধাবী এই পাঁচ নারী বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে তাদের উদ্ভাবনী আইডিয়া উপস্থাপন করেন এবং প্রমাণ করেন তথ্যপ্রযুক্তিতে নারীরা আর পিছিয়ে নেই। এ প্রোগ্রামেই আফসারা ও তার দল উপস্থাপন করেন ‘পোর্টেবল ওয়েব ইন এ বক্স’ আইডিয়া। তাসনিয়া ও তার দল উপস্থাপন করেন ‘ফ্লোটিং ইন্টারনেট’ আইডিয়া এবং ফারিয়া রহমান ও তার দল উপস্থাপন করেন ‘স্মার্ট ইলেকট্রিক গ্রিড’র আইডিয়া।

(৪)
বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নে শিল্পখাতে ফাইভজি’র ব্যবহার বৃদ্ধিতে আদিবা তাবাসসুম চৌধুরী উপস্থাপন করেন তার আইডিয়া। দ্য স্মার্ট ফ্যাক্টরি, ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অব থিংকস-এর মতো বিষয়গুলো এই আইডিয়াতে উন্মোচিত হয়।

যানজটে বিশ্বের শীর্ষে থাকা শহরগুলোর একটি ঢাকা। ট্রাফিক অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আইওটি প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই ক্ষতি অনেকাংশে হ্রাস করা যাবে। রুয়েটের রাবেয়া তুস সাদিয়া উপস্থাপন করেন আইওটি’র মাধ্যমে কিভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে সে আইডিয়া।

উল্লেখ্য, সিডস ফর দ্য ফিউচার ছাড়াও ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ডিজিটাল ট্রেনিং বাসের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল-কলেজের ২১ হাজারেরও বেশি ছাত্রীকে বিনামূল্যে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান দেয়া হয়েছে।

(৫)
নারীদের উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় যুক্ত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। ডাটারিপোর্টাল ডটকম অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৯.৫ শতাংশ নারী। তাই তথ্যপ্রযুক্তিখাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কার্যকরী নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে নানা উদ্যোগের। আমাদের মেনে নিতে হবে প্রযুক্তিখাতে নারীদের দক্ষতা এবং অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি খাত সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, বাস্তবায়িত হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প।

আপনার মতামত লিখুন :