বিয়ের নামে ‘প্রতারণার ফাঁদ’, অষ্টম স্বামীর সংবাদ সম্মেলন

0
173

বিয়ের নামে বহু পুরুষকে ফাঁদে ফেলে অর্থ-সম্পদ লুট, প্রতারণা, জালিয়াতি ও নিরীহ লোকদের মামলায় ফেলে হয়রানি করাসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠেছে খুলনার বহুল আলোচিত নারী সুলতানা পারভীন নীলা ওরফে বৃষ্টির বিরুদ্ধে। তার ফাঁদে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন একাধিক ব্যক্তি। তাকে গ্রেফতার এবং কঠোর শাস্তির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন আব্দুল বাকী নামের এক ভুক্তভোগী।

সোমবার (২২ মার্চ) দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে করে তিনি এ দাবি জানান। আব্দুল বাকী খুলনা মহানগরীর নাজিরঘাট এলাকার মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে।

লিখিত বক্তব্যে আব্দুল বাকী বলেন, ‘নগরীর সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার সুলতানুল আলম বাদলের মেয়ে সুলতানা পারভীন নীলা ওরফে সুলতানা পারভীন বৃষ্টি এ পর্যন্ত ৮-এর অধিক বিয়ে করেছেন। বিয়ে করে কিছুদিন পর সেই স্বামীকে ছেড়ে দেয়া এবং তার কাছ থেকে দেনমোহরের টাকাসহ নানা কৌশলে বাড়ি-গাড়ি হাতিয়ে নেয়াই তার ব্যবসা। তার মূল টার্গেট সম্পদশালী, ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী ও প্রবাসী পুরুষ। প্রথমে টার্গেট নিশ্চিত করে তিনি ধীরে ধীরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে নিজ দেহের সৌন্দর্য ও কথার মারপ্যাঁচে আটকে ফেলেন টার্গেটকৃত পুরুষদের।’

নীলার পুরুষ ঠকানোর উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৯৯ সালে সুলতানা পারভীনের প্রথম বিয়ে হয় মাদারীপুর জেলার হরিকুমারিয়া গ্রামের আলহাজ আব্দুল হাকিম শিকদারের জাপানপ্রবাসী ছেলে শাহাবউদ্দিন সিকদারের সঙ্গে। নিলার বয়স ছিল তখন ১৫ বছরেরও কম। কিছুদিন যেতে না যেতেই স্বামীর ঘর থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে বেরিয়ে যান তিনি। তার উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন ও মালামাল চুরির ঘটনায় শাহাবুদ্দিন শিকদার মাদারীপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেন। যার নম্বর-৭৩৮, তারিখ ১৯ ডিসেম্বর ১৯৯৯। ২০০১ সালে তার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে নীলার।’

তার দ্বিতীয় বিয়ে হয় ২০০৫ সালের ৬ মে খুলনা মহানগরীর শেরেবাংলা রোডের মো. মকবুল হোসেনের ছেলে এসএম মুনির হোসেনের সঙ্গে। তখন প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নিজেকে ‘কুমারী’ দাবি করে মুনির হোসেনের সঙ্গে এক লাখ টাকার কাবিননামায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। কিন্তু বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে নীলার উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন এবং ও উগ্র আচরণের শিকার হন স্বামী মুনির। এক পর্যায়ে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ নিয়ে এ বাড়ি থেকেও বেরিয়ে যান নীলা। এ ঘটনার একই বছরের ১০ ডিসেম্বর মুনির হোসেন তাকে তালাক দেন।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সুলতানা পারভীন প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে আবারও নিজেকে ‘কুমারী’ দাবি করে ২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে নগরীর খালিশপুর ওয়ারলেস ক্রস রোডের মৃত আলহাজ আব্দুল মান্নানের ছেলে ঠিকাদার মইনুল আরেফিন বনিকে বিয়ে করেন। তবে, শর্ত থাকে বিয়ের পর নীলা তার আত্মীয়ের মাধ্যমে বনিকে ইতালি নিয়ে যাবেন। শর্ত মোতাবেক বিয়ের পর তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে কিছুদিন যেতে না যেতেই নীলার প্রতারণা প্রকাশ পেতে থাকে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যেও বিচ্ছেদ ঘটে। এ ঘটনায় নিজেকে ‘কুমারী’ পরিচয় দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করায় স্বামী শেখ মঈনুল আরেফিন বনি খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে নীলার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

বনির সঙ্গে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় নীলা ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জের ইফতিখার নামে একজনকে বিয়ে করেন। সেখানেও দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয়নি তার। একপর্যায়ে ইফতেখার যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। ২০১২ সালে নীলা বিয়ে করেন বাগেরহাটের বাসিন্দা কামাল হোসেনকে, ২০১৭ সালে ইতালি প্রবাসী মাদারীপুরের মোহাম্মদ আজিমকে, ২০১৮ সালে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মোহাম্মদ রহমানকে এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে খুলনা মহানগরীর নাজির ঘাট এলাকার মো. আব্দুল বাকীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়।

আব্দুল বাকী বলেন, ‘আমার সঙ্গেও প্রতারণা করায় আমি তার বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে চেক ও টাকা-পয়সা চুরির অভিযোগে মামলা দায়ের করেছি। মামলাটি বর্তমানে পিবিআই ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ কার্যালয়ে তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জে অবস্থানকালীন ঢাকার একটি ফ্ল্যাট তার নামে লিখে না দেয়ায় তিনি তার আরও এক স্বামীকে নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসানো এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ২ মে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।’

নীলা চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে খুলনা মহানগরীর খালিশপুরে তার পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে আফরীন আহমেদ নামের এক আত্মীয়ের বাসায় কিছুদিন অবস্থান করেন। সেই সুযোগে আত্মীয়ের বাসা থেকে একটি চেকের পাতা চুরি করে আত্মীয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ লাখ টাকা তুলে আত্মসাৎ করেন। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও চুরির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলাটি বর্তমানে পিবিআই খুলনা কার্যালয়ে তদন্তাধীন রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, সুলতানা পারভীন নীলা কর্তৃক প্রতারণার শিকার তার এক স্বামী এস এম মহিবুর রহমান কর্তৃক অভিযোগের তদন্তে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. স্নিগ্ধ আকতার গত বছরের ৩০ জানুয়ারি পুলিশ সুপার বরাবর দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, সুলতানা পারভীন নীলা নিজেকে কুমারী, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তা দাবি করে কখনো সুলতানা পারভীন নীলা, কখনো সুলতানা পারভীন বৃষ্টি, কখনো শুধুমাত্র সুলতানা পারভীন নাম ব্যবহার করে ইতোপূর্বে আরও পাঁচটি বিয়ে করেছিলেন। এভাবে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে কিছুদিন অতিবাহিত করার পর তাদের প্রতি জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার, মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বিগত প্রত্যেক স্বামী কর্তৃক তালাক প্রাপ্ত হওয়ার পর তাদের বেকায়দায় ফেলতে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও দায়ের করেছেন। সাবেক স্বামীদের মধ্যে দুজন অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মারা গেছে বলেও জানা যায়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, খুলনা জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে অনুমোদিত তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, সুলতানা পারভীনের নিকাহ রেজিস্ট্রিকারী মাওলানা এ এস এম নুরুল হক বৈধ নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার নন। অবৈধ নিকাহ রেজিস্টার দ্বারা প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে সম্পাদিত করেন তিনি। বিয়ের পর সংসার পরিচালনার নামে অত্যন্ত সুকৌশলে নিজের খরচ বাবদ টাকা, দেনমোহরের টাকা এবং স্বামীর নামীয় ফ্ল্যাটবাড়ি নিজ নামে রেজিস্ট্রি করে নেয়ার জন্য স্বামীদের ওপর বিভিন্নভাবে অত্যাচার-নির্যাতন চালান। এমনকি বিয়ের কাবিননামায় টাকার অংক পরিবর্তন করে মোটা অংকের টাকা বসিয়ে দেন।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী আব্দুল বাকী বলেন, নীলার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে। অবিলম্বে তাকে গ্রেফতার এবং তার সব অপকর্ম তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি করেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুলতানা পারভীন নীলা জাগো নিউজকে বলেন, ‘সবকিছু হচ্ছে টাকার কারণে। আমি একজনের কাছে দুই লাখ টাকা পাব। সেই টাকা না দেয়ার ফন্দি এসব।’

তিনি বলেন, ‘বাকী আমাকে বিয়ে করেছে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে। তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আমাকে বিয়ে করে আমার কাছ থেকে বিভিন্ন সময় ব্যাংকের টাকা নিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ বাকী ও তার সহযোগিরা করেছে, তার কোনোটাই তারা প্রমাণ করতে পারবে না। যখন আমি আর টাকা দিতে পারিনি তখন থেকেই বাকী আমাকে নির্যাতন করে এসেছে।’

১০ লাখ টাকার বিষয়ে নীলা বলেন, ‘আমার টাকা আমাকে দিয়ে এখন তারা বলছে এটা নাকি আমি প্রতারণার মাধ্যমে করেছি। আমার বিরুদ্ধে তারা মামলাও করেছে। পিবিআই্ তদন্ত করছে। আমি পিবিআইকে সব প্রমাণ দিয়ে এসেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই বিষয়ে সবকিছু জানে। তাছাড়া তিনদিন আগে সোনাডাঙ্গা থানায় তিন পক্ষের বসাবসি হয়েছে। সেখানেও আমি সব প্রমাণ দিয়ে এসেছি। আমার পাওনা টাকা না দেয়ার জন্যই তারা এসব করছে।’

তবে তিনি বলেন, ‘আমার ভাগ্য খারাপ বলে চারবার বিয়ে হয়েছে।’

আপনার মতামত লিখুন :