প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষিত: না:গঞ্জ টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে খেলার মাঠে ভবন নির্মাণ ক্ষোভে ফুঁসছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহল সহ খেলোয়াড়রা

0
233

প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে, কোনো খেলার মাঠ নষ্ট করা যাবে না। তিনি একটা কথাই বলেন, খেলার মাঠ নষ্ট করে কোনো বিল্ডিং করা যাবে না। আজকে আমাদের দেশ খেলাধুলার মাধ্যমে সারাবিশ্বে বেশ পরিচিত। আর ফুটবল খেলা আমাদের গ্রাম বাংলার প্রাণের খেলা। অথচ নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পাঠানটুলী এলাকায় অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের খেলার মাঠে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। যার ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহল সহ জাতীয় এবং স্থানীয় খেলোয়াড়রা দারুন ক্ষোভ প্রকাশ করছে। ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী।

নারায়ণগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম মৃধা একুশের কাগজ কে জানান, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক (ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ফর এক্সাইটেড ৬৪ টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ) প্রকল্পের অর্থায়নে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ তলা ফাউন্ডেশন সহ ৫ তলা একাডেমী কাম ওয়ার্কসপ ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

তিনি আরো বলেন, এ বছরের ৩ মার্চ আমি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছি এবং ডিসেম্বরেই অবসরে যাবো। তবে তিনি ব্যথিত হয়ে বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠ হচ্ছে শিক্ষার সবচেয়ে বড় উপকরণ। পাঠ্য পুস্তকের গন্ডির বাইরে শিক্ষণ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় উপাদান হচ্ছে খেলার মাঠ। খেলার মাঠটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে জড়িত। প্রাকৃতিক নৈসর্গিকতা শিক্ষা গ্রহণের সহায়ক ভূমিকা পালন করে যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মনন ও সৃষ্টিশীল হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব শুধু সিলেবাস মুখস্থ করানো নয়? শিক্ষার বাইরে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার জন্য যা কিছু অনুশীলন করার দরকার তা প্রতিটি মানুষ তার শিক্ষালয় থেকে অনুশীলন করে আসে।

অধ্যক্ষ সেলিম মৃধা আরো বলেন, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেক জায়গা রয়েছে। মাঠের জায়গাটি রেখে ভবনটি অন্যত্রও করা যেত। না হয় আরো ১ কোটি টাকা অতিরিক্ত লাগতো। যাই হোক, যেহেতু ভবনের কাজটি শুরু হয়েছে তাই এটা বন্ধ করা যাবে না। ১৯৮৪ সালে একবার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছিল এখন অনেক বছর পর বর্তমানে আবার নতুন প্রকল্পের আওতায় কাজ শুরু হয়েছে তাই কাজ বন্ধ করা যাবে না। তবে আমি অবশ্যই মাঠের পক্ষে। খেলাধুলার মাঠ জরুরী।

বিগত ২০১৬ সাল থেকে নারায়ণগঞ্জ টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের খেলার মাঠটি রক্ষায় শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী আন্দোলন করে আসছিলো। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন সহ স্মারক লিপি প্রদান করেছে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ও অভিভাবক মহল নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনের এমপি একে এম শামীম ওসমানের সরাপন্ন হলে, তিনি খেলার মাঠ উন্মুক্ত করে দেওয়ার সুপারিশও করেছিলেন। কিন্তু প্রাক্তন অধ্যক্ষ দূর্নীতিবাজ প্রকৌশলী মামুনুর রশিদ মৃধা ক্ষুদ্ধ হয়ে খেলার মাঠটি বন্ধ করার চেষ্টা করে। আর তারই পরিকল্পনায় ভবন নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে খেলার মাঠ বন্ধ করে ভবন নির্মাণের প্রতিবাদ জানিয়ে এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তাদের দাবি একটাই। বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথার বাস্তবায়ন চাই। তিনি জেলা উপজেলায় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ নির্মাণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে তার কথা উপেক্ষিত হতে পারে না।

এই মাঠেই গড়ে উঠা জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক সুজন একুশের কাগজকে বলেন, খেলাধুলা আমাদের এই অঞ্চলের ঐতিহ্য। আগে অনেক খেলোয়ার তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখন নানা কারণে তা কিছুটা ভাটা পড়েছে। সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের স্কুল কলেজের ছেলেকে যদি মাঠে নিতে পারি তাহলে আজকে মাদকের যে ভয়াল অবস্থা তা থেকে কিছুটা বিরত রাখতে পারব। খেলাধুলাই একমাত্র সমাধানের পথ। আমরা খেলার মাঠ চাই। তা না হলে ভবিষ্যত প্রজন্ম বিপর্যয়ে পড়বে।
তিনি আরো বলেন, এই মাঠেই খেলাধুলা করে বড় হয়েছি। স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে খেলেছি। কিন্তু আজ বড়ই কষ্ট হচ্ছে।মাঠ বন্ধ করে ভবন নির্মাণ হচ্ছে।আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই অবশ্যই ভবন নির্মাণ বন্ধ করে খেলার মাঠ উন্মুক্ত করে দিবেন এবং প্রয়োজনে ভবনটি স্থানান্তরিত করবেন।
স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে সমাজকর্মী গোলাম মোস্তফা সার্চ্ একুশের কাগজকে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান না থাকায় শিক্ষার্থীদের মুক্ত চলাচল এবং পরস্পরের মাঝে সৌহার্দ্যবোধ গড়ে উঠছে না। আর এই কারণে সমষ্টিকতা সৃষ্টিতে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। ছোট থেকে বড় হয়েছি এই মাঠে খেলাধুলা করে আজ মাঠটিতে রাতের অন্ধকারে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু আমরা ভবন নির্মাণের বিপক্ষে নই। ভবনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই করা যায়। মাঠের পাশেই অনেক জমি পরে রয়েছে। আমরা মাঠ রক্ষায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও জেলা শিক্ষা অফিস সহ নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
উল্লেখ্য যে, জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন পাঠানটুলীতে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ। ১৯৮৪ সালে প্রায় ৬.৫ একর জমির উপর বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন ভোকেশনাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউট হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। তখনকার সময়ে অটোমোবাইল, ওয়োল্ডিং, রেডিও টিভি, আর এসিসহ ৪টি ট্রেডে বেকার যুবক যুবতিদের জন্য ট্রেনিং প্রদান করে স্বাবলম্বি হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। যা পরবর্তীতে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে মান বৃদ্ধি করে ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নাম পরিবর্তন করে নারায়ণগঞ্জ টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ করা হয়। বর্তমানে প্রায় হাজারের উপরে ছাত্র ছাত্রী রয়েছে অত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।আর খেলার মাঠ নষ্ট করে যে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে তার দৈর্ঘ্য ২১৫ থেকে ২৩৫ ফুট প্রস্থের।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় খেলার মাঠ রক্ষায় একজোট হয়ে আন্দোলনে নামছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহল সহ বিভিন্ন খেলোয়াড় এবং এলাকাবাসী।
এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সহ স্থানীয় প্রশাসন কে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
আরো খবর জানতে চোখ রাখুন একুশের কাগজে। (চলবে)
আপনার মতামত লিখুন :