সাইবার দুনিয়া বনাম গণমাধ্যম: সম্ভাবনা নাকি ঝুঁকি? মাসুদ করিম

0
42

রিয়েল লাইফ কোনটি? যেটি ফিকশন নয়, গল্প নয়, বাস্তব জীবনযাপনের অনুষঙ্গ; আমাদের চারপাশ হলো রিয়েল লাইফ। যেমন— মানসুরা রিয়েল লাইফে ঢাকায় বাস করেন। এটি হলো— কথিত রিয়েল লাইফ। অফলাইন।

আবার মানসুরা যদি সেলিব্রিটি হন, তবে তিনি তার গল্পের চরিত্রে হলিউড, বলিউড কিংবা দুবাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডে বাস করতে পারেন। এটি হলো সেলুলয়েড থেকে পরিবর্তন হয়ে আজকের সাইবার দুনিয়া। অনলাইন।

ইন্টারনেট আসার পর সাইবার সংস্কৃতি এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে, কেউ কেউ সাইবার দুনিয়াকেও রিয়েল লাইফের অংশ বলে মনে করেন।

ইন্টারনেট আমাদের জীবনধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে তাকে অনেক সহজ করে তুলেছে। বিদেশে থাকা বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন কিংবা যে কাউকে টেলিফোন করতে একদা অনেক খরচ করার প্রয়োজন ছিল। বিদেশে উড়ে যাওয়াও ব্যয়বহুল কাজ। এখন হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার, ইমোসহ নানা ধরনের ইন্টারনেটভিত্তিক টুলস বের হয়েছে। ফলে দুনিয়াটা এখন হাতের মুঠোয়, মোবাইল ফোনের মধ্যে। মহামারিকালে জুমের মাধ্যমে মিটিং ও ওয়েবিনার হয়েছে, যা অনেক বেশি সহজে সবার অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল যে, ইন্টারনেট হলো প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারের একটি মাধ্যম। কারণ এর মধ্যে অনেক ক্ষতিকর বিষয় থাকে, যা শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তারা নেশার কবলে পড়তে হতে পারে। পর্নো কিংবা গেমের কোনো কোনো কন্টেন্ট শিশুদের নিষিদ্ধ জীবনে হাতছানি দিতে পারে। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি সেই ধারণাকে উল্টে-পাল্টে দিয়েছে।

মহামারিকালে আমাদের শিশুদের শ্রেণিকক্ষের বদলে অনলাইনে ক্লাস করতে হয়েছে। শিশুরাও অনলাইন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু তাদের জীবনে মুখোমুখি ক্লাস যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি দেড় বছর পর স্কুল খোলা হলে তা দেখেছি।  শিশুরা আনন্দে আত্মহারা। খোলা মাঠে দৌড়ঝাঁপ। বাতাস থেকে এভাবে সরাসরি অক্সিজেন পেয়ে জীবনের উচ্ছ্বাস বাড়িয়ে দেওয়া সাইবার দুনিয়ার পক্ষে সম্ভব নয়। রিয়েল লাইফে পারিবারিক জীবনের যে ছোঁয়া পাওয়া যায়, সাইবার লাইফে তা সম্ভব নয়। খেলাধুলা, গান-বাজনা, কর্মক্ষম শরীর গঠন রিয়েল লাইফে সম্ভব। সাইবার লাইফে সম্ভব নয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসায় মানুষের অনুভূতিগুলো দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ফেসবুকে কারও মৃত্যু সংবাদে আমরা দুঃখপ্রকাশের পর পরই একজনের জন্মদিনের ছবিতে শুভেচ্ছা জানাই। জীবনধারার এই পরিবর্তন ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক সেই বিচার বিশ্লেষণের আগেই নতুন নতুন প্রযুক্তি হয়তো আরেক নতুন বাস্তবতার মুখে ফেলে দিচ্ছে।

সাইবার দুনিয়ার অনেক ভালো দিক আছে। কিন্তু মন্দ দিকও কম নয়। সাইবার বুলিং কিংবা সাইবার রোমান্সের বিষয়টি বিবেচ্য। সেখান থেকে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে থাকে। তাই সাইবার স্পেসকেও নিয়ম-কানুনের মধ্যে রাখা, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষা করা, শিশুদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তা দিনের পর দিন স্পষ্ট হচ্ছে। এসব না করা হলে সরল বিশ্বাসী মানুষ ডিজিটাল দুনিয়ায় পরিবর্তনের ধারায় অপরাধের শিকার হতে পারেন।

গণমাধ্যমের ওপর সাইবার পৃথিবীর প্রভাব ব্যাপক। আমরা পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। একটা সময় ছিল যখন সিসার তৈরি অক্ষর পাশাপাশি বসিয়ে সংবাদপত্র মুদ্রণ হয়েছে।  কম্পিউটার আসার পর হাজার হাজার মুদ্রণশিল্পী বেকার হয়ে পড়েন। সংবাদপত্রে কম্পিউটার কম্পোজ প্রযুক্তি প্রতিস্থাপনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন হয়েছে। প্রযুক্তি ঠেকানো যায়নি।

মিডিয়ায় এখন পরিবর্তন এত দ্রুত হচ্ছে, যা অনেক মিডিয়াকর্মী নিতে পারছেন না। প্রথাগত মিডিয়াগুলো এখন সাইবার মিডিয়ায় রূপান্তর হচ্ছে। পরিবর্তনের বর্তমান ধারা চলমান থাকলে প্রথাগত সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশনের মধ্যে নানাবিধ অনুষঙ্গ বদল তথা যোগ-বিয়োগ অস্বাভাবিক নয়। ফলে সাংবাদিকতার ধারাতেও নতুন নতুন স্টাইলের পুনঃ পুনঃসংযোগের বিষয়গুলোতে অভ্যস্ত হতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে লক্ষণীয় যে, সব পত্রিকা ও টিভি তাদের অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করছে। কেউ কেউ অনলাইনে বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন সংযুক্ত করেছে।

মহামারিকালে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন থেকে আয় মারাত্মক কমে যাওয়ায় বিশ্বের অনেক দেশেই পত্রিকাগুলো মুদ্রণ সংস্করণ বন্ধ করে দিয়েছে। অনলাইন সংস্করণের প্রতি জোর দিচ্ছেন তারা। ট্যাবলয়েড সাইজের পত্রিকা যেগুলো মেট্রো স্টেশনে বিক্রি হয়; ওই সব পত্রিকায় মুদ্রণ সংস্করণ আছে। মেট্রোতে থাকাকালে পত্রিকা পড়ে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে ট্যাবলয়েড দৈনিক অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডাস্টবিনে চলে যায়। বাংলাদেশে মুদ্রিত পত্রিকার ভবিষ্যৎ কী হবে সেটিও সহজে অনুমেয়।

আপাতত পাঠক কিংবা দর্শকের মনোযোগ মাল্টিমিডিয়ার প্রতি। মহামারির সময়ে মুদ্রিত পত্রিকার সার্কুলেশন অনেক নেমে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে রাজস্বও কমে যায়। ওই সময়ে টিভির পর্দায় খবর দেখেছে মানুষ। এখন দেখা যাচ্ছে, টিভির দশাও একই হয়ে যাচ্ছে। সাইবার জগতে মানুষের ঝোঁক দেখে টিভিগুলো সংবাদ ওয়েবসাইট খুলেছে। ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবে সংবাদ কিংবা ফুটেজ শেয়ার দিচ্ছে। সংবাদপত্রে আমরা যেমন বলি নিউজ রুম, মাল্টিমিডিয়ায় এটাকে বলে কম্পাইল রুম। মিডিয়ার প্রতিনিধি সংবাদ পাঠালে ওখানে একটা ক্যামেরাম্যানও পাঠানো হয়। কিংবা প্রতিনিধি নিজেই মোবাইল ফোন দিয়ে একটু ভিডিও পাঠান। সংবাদের সঙ্গে তা জুড়ে দেওয়া হয়। তার সঙ্গে অডিও কিংবা সাউন্ডবাইট কিংবা স্থিরচিত্র সংযুক্ত করা হয়। এভাবে একটা কম্পাইল রুমের মাধ্যমে যে স্টোরিটা উপস্থাপিত হয় তাতে কোনও ব্যস্ত মানুষ পুরো স্টোরি না পড়েও ভিডিওতে ক্লিক করে একটু দেখে আন্দাজ করতে পারেন। মিডিয়ায় উপস্থাপনের ঢং আপাতত এই পর্যায়ে ঠেকেছে।

সাইবার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে কেউ কেউ বলেন ইনফোটেইনমেন্ট। এই ধরনের সাংবাদিকতায় তথ্যের পাশাপাশি বিনোদনও থাকতে হয়। পৃথিবীতে নানা ধরনের মানুষ আছে যাদের নানা ধরনের শখ কিংবা নেশা আছে। কেউ হয়তো সারাদিন বসে বসে মাছ ধরার ভিডিও দেখছে। এটা তার বিনোদন। কেউ হয়তো ছাদে বাগান করার ভিডিও দেখে। এসব ভিডিওতে তথ্য সন্নিবেশিত করে এটাকে সংবাদ আকারে পরিবেশন করা যায়। এটাই হলো ইনফোটেইনমেন্ট। ফলে ডিজিটাল মাধ্যমে সাংবাদিকতায় সংবাদকে আকর্ষণীয়ভাবে পরিবেশন করাটা খুবই জরুরি। এ জন্যে যথাযথ এডিট করাটা খুবই প্রয়োজন। ভিডিওতে শব্দের গুণগত মান, লাইটিং, কালার ইত্যাদি ঠিক আছে কিনা সেটা জরুরি। এক্ষেত্রে, অনেকে ভিডিওর সঙ্গে সাবটাইটেল জুড়ে দিচ্ছেন। এভাবে সংবাদকে আকর্ষণীয় করছেন। সংবাদপত্রের ওয়েবসাইটে হুবহু টিভির মতো সংবাদ দিচ্ছে, টকশো করছে। আবার টিভিগুলো তাদের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ওয়েবসাইটে টেক্সট আকারে সংবাদ প্রচার করছে। এ জন্যে অনলাইনে আলাদা লোকও নিয়োগ করছে। ফলে সংবাদ মাধ্যমগুলোর মাল্টিমিডিয়ায় রূপান্তরের অবস্থায় ডেস্কে কাজ করা কোনো সংবাদকর্মী শুধু অনুবাদ কিংবা সম্পাদনার কাজ করলে চলে না; তাকে বিভিন্ন উপায়ে সংবাদের সত্যতা যাচাইও করতে হয়।

সাংবাদিকতার একটা নতুন ফর্ম বের হয়েছে। মোবাইল ফোন ব্যবহার করে যে কোনো মানুষ সাংবাদিকতা করতে পারেন। এমন মোবাইল জার্নালিজমকে মজো কিংবা সিটিজেন জার্নালিজম নামে কেউ কেউ অভিহিত করেন। বয়স কিংবা অভিজ্ঞতা নেই এমন মানুষ সামনে কোনো কিছু দেখলে সেটিকে মোবাইল ফোনে ধারণ করে অনেকটা আনকাট কিংবা কাঁচামাল ফর্মে পরিবেশন করেন। কোনো গণমাধ্যমে পরিবেশন সম্ভব না হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ করা যায়। তবে দক্ষ ও পেশাদার সাংবাদিকদের অনেকে এমন ধরনের কাজকে পুরোপুরি সাংবাদিকতা মানতে নারাজ। তারা মনে করেন, এতে ভয়াবহ বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। দায়িত্বশীলতার অভাব থাকতে পারে। কেননা এতে ঘটনাকে খণ্ডিতভাবে দেখানোর প্রবণতা থাকে, যাতে পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গির অভাব লক্ষণীয়। মুদ্রার অপর পিঠ অজানা থাকে। কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড কিংবা প্রেক্ষাপট থাকে না। সবচেয়ে বড় কথা পরিবেশনাটি নির্মোহ নয়। তবু এমন সাংবাদিকতাকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।

ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিভিশন (আইপিটিভি) এবং ওভার দ্য টপ (ওটিটি) কিংবা ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমেও অনেকে সাংবাদিকতা করেন। এসব মাধ্যম ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। আইপিটিভি অনেকটা সরকারের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের মতোই সম্প্রচার হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এসব আইপিটিভিকে নিবন্ধনের মাধ্যমে নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করছে। কেননা অনেক আইপিটিভি সম্প্রচারের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন, নিয়োগ বাণিজ্য, মানহানি কিংবা চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ উঠছে। ওটিটি প্ল্যাটফরম সাধারণত ফিকশন সিরিয়াল প্রচার করে। বিভিন্ন মুভি প্রচারও তাদের কর্মকাণ্ডের অংশ। ওটিটি প্ল্যাটফরমে নাম সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। কারণ ওটিটি প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে নন-ফিকশন তথ্যচিত্র নির্মাণের ঘটনাও ঘটছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া হাউসের সঙ্গে সহযোগী হয়ে ওটিটি প্ল্যাটফরম গড়ে উঠছে। আজকাল সংবাদপত্র ও টিভি উভয়ের আয় কমে যাওয়ায় ওটিটি থেকে আয় বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। সরকার ওটিটিকেও নিবন্ধনের আওতায় আনার লক্ষ্যে সচেষ্ট যা বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে।

সাইবার মাধ্যমগুলোর কারণেও প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া হাউসগুলোর আয় কমে যাচ্ছে। গুগল ও ফেসবুক বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট, ফিচার, অন্যান্য কন্টেন্ট শেয়ার করছে। এভাবে গুগল ও ফেসবুক আয় করছে। অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি একটা আইন করেছে যে, তাদের দেশের মিডিয়ার কন্টেন্ট শেয়ার করে গুগল ও ফেসবুক যে আয় করে তার একটা অংশ মিডিয়াগুলোকে দিতে হবে। সার্চ ইঞ্জিন গুগল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক প্রত্যেক মিডিয়ার সঙ্গে আলাদা চুক্তি করে আয়বণ্টন নির্ধারণ করে। আইনটি করতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

গুগল ও ফেসবুক কিছুতেই তাদের আয়ের অংশ মিডিয়াকে দিতে রাজি ছিল না। তাদের বক্তব্য হলো—মিডিয়ার খবর শেয়ার করার সুযোগ দিয়ে মিডিয়াকে বেশি পাঠক কিংবা দর্শকের সামনে নিয়ে যাচ্ছে গুগল, ফেসবুক। তখন মিডিয়া মোগলখ্যাত রুপার্ট মারডকসহ মিডিয়াগুলো অস্ট্রেলিয়ার সরকারকে জানায় যে, গুগল ও ফেসবুক খুবই কঠিন পক্ষ। তাদের সঙ্গে দর-কষাকষির সক্ষমতা মিডিয়াগুলোর নেই। এই ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়ার সরকার তখন মিডিয়াগুলোকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে। গুগল ও ফেসবুকও কম যায় না। সরকারের আইন করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গুগল ও ফেসবুক তাদের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় নিউজ শেয়ার বন্ধের হুমকি দেয়। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে টেলিফোনে কথা বলেন। চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত গুগল ও ফেসবুক আয় শেয়ার করতে রাজি হয়। অস্ট্রেলিয়া এভাবে পার্লামেন্টে আইন পাস করে।

ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সংবাদপত্র ও টিভি প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়েছে। নিউজের জন্য অনেকে ফেসবুক কিংবা টুইটার দেখেন। ফলে প্রতিযোগিতা সংবাদ ও আয় উভয় ক্ষেত্রে পড়েছে। পরিবর্তনের ধারা দেখে অনেকে মনে করেন, সংবাদপত্র ও টিভি টিকে থাকার জন্য নতুন অনুষঙ্গ যুক্ত করবে। তবে এটি সবাই মানছেন যে, পরিবর্তনের এই ধারা সত্ত্বেও সাংবাদিকতা থাকবে। সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি করে দেখা দেবে। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সাইবার মিডিয়া গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়। এগুলো অনেক দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এখন তাই বিভিন্ন ফ্যাক্ট চেকিং গ্রুপ বের হয়েছে। মিথ্যা তথ্য অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়। গুজব ছড়িয়ে তুলকালাম ঘটানো হয়। ফলে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এই সময়ে সাংবাদিকের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। সাংবাদিককে দায়িত্বের সঙ্গে সত্য তুলে ধরতে হবে খবর। সেখানে থাকবে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য, যা জীবনকে রক্ষা করবে, মানুষকে সুরক্ষা দেবে এবং অধিকার নিশ্চিত করবে।

গুজব চেনার উপায় কি?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের নির্বাচনের সময়ে গুজব তথা বিভ্রান্তিকর তথ্য বেশি ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশেও বিগত নির্বাচনে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর কথা ওঠে। কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, রাজনীতির আদর্শ প্রচার, ধর্মীয় প্রপাগান্ডা ছড়ানোর মতো কাজে মিথ্যা তথ্য কিংবা গুজব ছড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯০ সালে ফটোশপ আবিষ্কারের পর এই টুলস ব্যবহার করেও গুজব ছড়ানো হয়। ফটোশপে এডিট করে ভুয়া ছবি মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এখন আবার ভিডিও এডিট করে ভুয়া ফুটেজ ছড়ানো হচ্ছে। ভিডিওতে একজন যেসব কথা বলছেন, সেগুলো সরিয়ে সেখানে নতুন শব্দ জুড়ে দেওয়া হয়, যা হুবহু ঠোঁটের নাড়াচাড়ার সঙ্গে মিলে যায়।  ডাবিং এমন নিখুঁতভাবে করা হয়, যা ধরা এক রকম অসম্ভব। সেখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে হলিউডের মতো অ্যাফেক্ট জুড়ে দেওয়া হয়। এগুলোকে বলা হয় ‘ডিপ ফেক’। একমাত্র ফরেনসিকের মাধ্যমে সেগুলো ধরা সম্ভব। ভারতে হোয়াটসঅ্যাপে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায় বেশি। ইউটিউবে ট্রেন্ডিং অনেক কিছুই আছে যা ভুয়া। ছেলে ধরার গুজব রটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। খারাপ খবর কিংবা গুজব দ্রুত ছড়ায়। এটি মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল কন্টেন্টে এটি চোখে পড়ে। এগুলো যাচাই ছাড়া সাংবাদিকের গ্রহণ করা উচিত নয়।

গুজব বা মিথ্যা তথ্য পরিহারের উপায় হলো— প্রাথমিক উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা। এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। সেকেন্ডারি উৎস হলে সেটি বিশ্বাসযোগ্য কোনো সংবাদমাধ্যম হতে হবে। যাচাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য ব্যবহার করা মোটেও সমীচীন নয়। কিছু কিছু অনলাইন টুলস ব্যবহার করে সংবাদ, ছবি কিংবা ভিডিও সঠিক কিনা তা যাচাই করা যায়। তার অন্যতম টুলস হলো গুগল। গুগল নিউজ, চেক এক্সপ্লোর, ইমেজ সার্চার, সার্চ গুগল ফর ইমেজ অপশনে গিয়ে ছবি আপলোড করলে তা জানা যায়। এ ছাড়া অনেক ফ্রি টুলস পাওয়া যায়,  সেগুলো ব্যবহার করে যথার্থতা নিরূপণ করা যায়।
গুজব সাধারণত রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা বিভিন্ন ধরনের মতাদর্শ কিংবা ভাবধারাকে কেন্দ্র করে ছড়ানো হয়। ফলে এসব আদর্শের ধারকরা এটিকে সহজেই বিশ্বাস করেন। তারা এটি শেয়ার করতে থাকেন। সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো— মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহ ও বিপরীত আদর্শ দিয়ে বিষয়টিকে চিন্তা করা। টেকনোলজি কোম্পানিগুলোর উচিত বিভ্রান্তিকর তথ্য খুঁজে বের করার টিম গড়ে তোলা।

ঘৃণা ছড়ানো প্রতিরোধ করা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বিভিন্ন ব্লগের মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো, গালি দেওয়া, মানহানিকর মন্তব্য জুড়ে দেওয়া এবং বিকৃত তথ্য উপস্থাপন প্রভৃতি দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো— এগুলোকে আবার অনেকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে যৌক্তিক বলে ব্যাখ্যা করেন। অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পোস্ট, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, বিকৃত ছবি, বিভিন্ন অশালীন সম্পর্ক সৃষ্টির প্রয়াস ইত্যাদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নাম দিয়ে যৌক্তিক প্রমাণ করা যায় না। বিশেষ করে কোনো তথ্য কিংবা পোস্ট দিয়ে কারও অধিকার হরণ করলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে যৌক্তিক প্রমাণ করা যায় না। সব মানুষের অধিকার সুরক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে মূলধারার সাংবাদিকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ প্রচার কিংবা মতাদর্শসংবলিত পোস্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

আইনিব্যবস্থার মাধ্যমে এসব সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা যেগুলো সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্ভব; ওই সব ধারার ব্যাপারে সাংবাদিকদের উদ্বেগ রয়েছে। পুরো আইন নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। ফলে সাইবার অপরাধ হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করা যায়। সাইবার অপরাধের জন্য এই আইনে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে। থানায় সরাসরি অভিযোগ কিংবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশের সহায়তা নেওয়া যায়। সরকারের আইসিটি বিভাগে সাইবার সহায়তা হেল্প ডেস্ক রয়েছে।
সাম্প্রতিককালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাক্তিগত গোপনীয় ফোনালাপ ফাঁস করে তা ভাইরাল করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যারা এসব করেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়। সরকার ব্যাক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়টি সেখানে সন্নিবেশিত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সাইবার জগতে বিভিন্ন ধরনের অপরাধী ওঁৎ পেতে থাকে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো যায়। অচেনা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণে সাবধানতা অবলম্বন, ব্যাক্তিগত তথ্য ও ট্যাগ অপশন উন্মুক্ত না রাখা, উসকানিমূলক ছবি কিংবা ভিডিও শেয়ার না করা, সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক না করা, কাজ শেষে লগআউট করে রাখা, বিকাশ কিংবা নগদের মতো আর্থিক লেনদেনে সাবধানতা অবলম্বন বিশেষ করে পিন নম্বরের গোপনীয়তা রক্ষা করা, লটারিতে টাকা পাওয়া কিংবা সরকারি অনুদান পাওয়ার মতো প্রলোভনে সাড়া দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রভৃতি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।

শেষ কথা

ইন্টারনেটের কারণে গণমাধ্যম একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি যুগপৎ ঝুঁকি ও সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিককে সাংবাদিকতার নিয়ম নীতির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষ করে গড়ে তোলা এখন সময়ে দাবি। সাংবাদিক কি শুধু তথ্য পরিবেশন করে? এটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই ধারণা এখন বদ্ধমূল হচ্ছে যে, দায়িত্বশীল উপায়ে সংবাদ পরিবেশন করে রাষ্ট্রে ও সমাজে সংহতি প্রতিষ্ঠা করাও সাংবাদিকের দায়িত্ব। সংবাদ বিভক্তিও সৃষ্টি করতে পারে; পারস্পরিক আস্থাও সৃষ্টি করতে পারে। সহনশীল, ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিকের ভূমিকা রাখার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে সাইবার মাধ্যমের সুযোগে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য যখন মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করছে; তখন সাংবাদিকের প্রয়োজনীয়তা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি হয়ে দেখা দিয়েছে। সমাজের কল্যাণের লক্ষ্যে সাংবাদিকতার শক্তিকে ব্যবহার করার এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।  বিশেষ করে সাইবার পৃথিবীতে বিকৃতি ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রয়াস চালানোর এখনই সময়।

আপনার মতামত লিখুন :